ভুলটা হলো আসক্তি
ঠাকুরের মন্দিরে দুইজন ভক্ত বসে আছেন। একজন আরেকজনকে জিজ্ঞাসা করছেন কত হলো? উত্তরে বললেন ষাটের ঘরে ঢুকে গেছি। আবার প্রশ্ন, কিভাবে খরচ করলেন দিনগুলি কি করলেন জীবনে? উত্তর এলো, জীবনটা শুধুই ভুলে ভরা। ভুলের পর ভুল। এই ধরুন, আমার জন্মের কথা। এটাতো আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তারপর আমার বড় হওয়া। সে তো প্রকৃতির কাজ। বিজ্ঞান বলছে গ্ৰোথফ্যাক্টর। তারপরে শিক্ষা। সেটিও হলো পরিবারের পরিকল্পনা। তাহলে এর কোনটাই তো আমার হাতে ছিল না। আর এরপরে সবচেয়ে বড় ভুলটা হল আমার সংসারে প্রবেশ। না, হয়তো কথাটা ভুলই বললাম। মানুষ তো সংসারেই আসে। এই জগৎটাই তো মানুষের সংসার। নানারকম বৈচিত্রের মাঝে মানুষের বিচরণ। পৃথিবীতে প্রবেশ মানেই মানুষের সংসারে প্রবেশ। তাহলে ভুলটা কোথায়? আমাদের শাস্ত্র বলছে ভুলটা হলো সেইটাই, সেই আসক্তি। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরার অধিকার দেওয়া। ঠাকুর বলেছিলেন, মানুষ মনেই মুক্ত মনেই বদ্ধ। একের পর এক শৃংখল সে তো মনেরই রচনা। তাহলে এর রচয়িতা কে? উত্তর হল-অহংকার। হ্যাঁ, এই অহংকারের নামই "আমি"। এই আমির আসক্তি, আমির প্রত্যাশা। "আশা"সে বোধহয় একরকম ভালো। মেঘের আশায় আকাশ। চাষির আশা বৃষ্টি। চাতকের আশা স্বাতী নক্ষত্রের জল। মানুষের আশা অদৃশ্য কোন শক্তির কাছে। কেউ বলেন ঈশ্বর, কেউ বলেন ভাগ্য। আসলে প্রত্যাশাই যত হতাশার উৎস। মানুষের প্রত্যাশা ব্যক্তি- মানুষের কাছে, সমাজের কাছে, প্রতিষ্ঠানের কাছে, সরকারের কাছে। সবচেয়ে সাংঘাতিক হলো—এক "আমি"র কাছে আর এক "আমি"র পারস্পরিক প্রত্যাশা। আমাকে কেউ কিছু দেবেনা। আমি কিছু চাইনা । চাওয়াটা কমাতে কমাতে শূন্য করে ফেলতে হবে। কিন্তু সেটা কি সম্ভব? ঠাকুর বলছেন অবশ্যই সম্ভব। সেই পথটি হল সমর্পণের পথ। আন্তরিক সমর্পণ। এর জন্য আলাদা ধরনের একটা সাহস চাই এবং শিশুর মতো সরল হওয়া চাই। বলতে হবে, মা, আমি তোমার সন্তান। আমি কাঁদতে পারি, চাইতে পারি না। আমার প্রয়োজন তুমি জানো। এ হলো উজ্জ্বল আধ্যাত্মিক জীবন। আমার প্রয়াস থাকবে, কিন্তু আকাঙ্ক্ষা থাকবে না।

