নিজস্ব প্রতিনিধি: ঠিক ১৭১ বছর আগে, ৩১ মে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক দক্ষিণেশ্বর মন্দির। স্বতন্ত্র খবর ফিরে দেখল সেই মন্দিরের ইতিহাস। ১৮৫৫ সালের ৩১ মে জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার পুণ্যতিথিতে পথ চলা শুরু করেছিল কলকাতার বুকে এক পরম পবিত্র তীর্থক্ষেত্র দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির। লোকমাতা রানি রাসমণির হাত ধরে গড়ে ওঠা এই মন্দির আজ শুধু বাংলার নয়, সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের এক পরম আস্থার স্থল। কিন্তু এই ইতিহাস সৃষ্টির নেপথ্যে জড়িয়ে রয়েছে এক অলৌকিক স্বপ্নাদেশ এবং এক নারীর সামাজিক লড়াইয়ের অদম্য কাহিনি। কাশীযাত্রার রাতে সেই অলৌকিক স্বপ্নাদেশ ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, ১৮৪৭ সালে রানি রাসমণি তাঁর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং দাসদাসীদের নিয়ে বিশাল সাড়ম্বরে নদীপথে কাশীযাত্রার সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ করেছিলেন। যাত্রার ঠিক আগের রাতে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। রানি রাসমণি স্বয়ং মা কালীকে স্বপ্নে দর্শন করেন। দেবী মহামায়া তাঁকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, কাশী যাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। গঙ্গাতীরেই একটি নয়নাভিরাম মন্দিরে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পুজো কর। সেই মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েই আমি তোর পুজো গ্রহণ করব। মায়ের এই স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর রানি রাসমণি তাঁর কাশীযাত্রা বাতিল করেন এবং গঙ্গাপাড়েই মন্দির তৈরির সঙ্কল্প নেন। আট বছরের কঠিন সাধনা ও বিশাল ব্যয় স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর পরই শুরু হয় মন্দির নির্মাণের মহাযজ্ঞ। তৎকালীন সময়ে গঙ্গাতীরে উপযুক্ত জমি খুঁজে পাওয়া মোটেই সহজ ছিল না। জমি পেতে রানিকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। অবশেষে দক্ষিণেশ্বরে জমি সুনিশ্চিত করার পর, দীর্ঘ আট বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে ওঠে আজকের এই অপরূপ সুন্দর নবরত্ন মন্দির। সেই যুগে এই মন্দিরটি নির্মাণ করতে রানি রাসমণিকে খরচ করতে হয়েছিল প্রায় নয় লক্ষ টাকা, যা তৎকালীন সময়ে এক বিপুল অঙ্কের অর্থ ছিল। সামাজিক বাধা ও ব্রাহ্মণ সমাজের বিরোধিতা মন্দির প্রতিষ্ঠার পথ রানি রাসমণির জন্য একেবারেই মসৃণ ছিল না। মাহিষ্য রাজপরিবারের সদস্য হওয়ায় সেই সময়কার কট্টরপন্থী ব্রাহ্মণ সমাজ তাঁর এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। নিম্নবর্ণের একজন মহিলার তৈরি মন্দিরে পুজো করা বা অন্নভোগ দেওয়া নিয়ে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়। কিন্তু রানি রাসমণি ছিলেন একজন অত্যন্ত তেজস্বী এবং দূরদর্শী নারী। সমস্ত সামাজিক বাধা, কুসংস্কার এবং তীব্র রক্ষণশীলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি তাঁর লক্ষ্যে অবিচল থাকেন। অবশেষে স্নানযাত্রার পুণ্যলগ্নে মহাসাড়ম্বরে মা ভবতারিণীর মূর্তি মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে এই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত হিসেবে যোগ দেন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, যাঁর সাধনায় দক্ষিণেশ্বর হয়ে ওঠে বিশ্বখ্যাত এক আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। রানি রাসমণির সেই দিনের সেই অদম্য জেদ আর ভক্তির ফসল আজ বিশ্বের দরবারে বাংলার সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে।