নিম্ন প্রবৃত্তির জয়!
একবার এক সেনাধ্যক্ষ বুদ্ধের কাছে গিয়ে নিবেদন করলেন, " হে তথাগত, কর্তব্য সম্বন্ধে আমার মনে এক সংশয় উপস্থিত হয়েছে। আমি একজন সৈনিক। রাজা আমাকে নিযুক্ত করেছেন তাঁর রাজ্যে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য। আপনি অহিংসা ও করুণার বাণী প্রচার করেন, হে মহামতি, আপনি কি অপরাধীর শাস্তি অনুমোদন করেন? তার উত্তরে বুদ্ধ বলেছিলেন, "যে শাস্তির যোগ্য তাকে শাস্তি দেওয়া এবং যে পুরস্কারের যোগ্য তাকে পুরস্কৃত করা কর্তব্য ; কিন্তু সেই সঙ্গে সর্বজীবে প্রেম করুণা ও অহিংসার উপদেশও পালন করতে হবে। আমার এই নির্দেশের মধ্যে স্ববিরোধিতা কিছু নেই। অপরাধীকে সাজা দিতে হবে তার অপরাধের জন্য কিন্তু অন্তর থাকবে দয়া ও প্রেমের ভাবে পূর্ণ। বুদ্ধ আরো বললেন, হে সেনাপতি, যে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এমনকি তা যদি ন্যায় যুদ্ধও হয় তাহলেও তার শত্রুহাতে নিহত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত, কারণ সৈনিকের পরিণতি হল তাই। যে জয়লাভ করে তারও স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, পার্থিব বিষয় সম্পদ ক্ষণিক, আজ আছে কাল নেই। সাফল্য যাই হোক, যত বিরাটই হোক, ভাগ্যচক্র যেকোনো মুহূর্তে বিপরীত দিকে আবর্তিত হয়ে পুনরায় তাকে ধুলোয় লুন্ঠিত করতে পারে। একজন বিজয়ী সেনাপতি শ্রেষ্ঠ কিন্তু যে আত্মজিৎ সে শ্রেষ্ঠতর। আত্মজয় করতে পারলে ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন হয়। যে আপন প্রবৃত্তিসমূহ জয় করেছে সে, প্রবৃত্তির দাসের চেয়ে অবশ্যই মহত্তর ব্যক্তি। সে-ই প্রকৃত বিজয়ী, জীবনের উপর অধিকার তারই বেশি। যার মন সম্পূর্ণ মোহমুক্ত, সে-ই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে এবং কখনো সে জীবন সংগ্রামে পরাজিত হয় না। যীশু বলেছেন, সারা পৃথিবী জয় করেও নিজের মনের কাছে হার স্বীকার করে লাভ কি? কেউ নিজেকে অপরাজেয় বলে মনে করতে পারে, এমনকি সমগ্র জগৎ তাকে দিগ্বিজয়ীর সম্মান দিতে পারে, কিন্তু পার্থিব সুখ সুবিধার বিনিময়ে যে নিজের আত্মাকে বিকিয়ে দেয় আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে তাকে বিজয়ী বলা যায় না। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, মানুষের মনুষ্যত্ব তখনই প্রকাশ পায় যখন সে তার আন্তর এবং বাহ্য উভয় প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এদের উপর মাথা তোলার চেষ্টা করে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে যে সমতা রক্ষা করে চলতে পারে, সে-ই ধন্য।

