ভাইফোঁটায় নিরঞ্জন, ময়নাপুরের দেওয়ানবাড়িতে ৩৭১ বছরের প্রাচীন পুজো
নিজস্ব প্রতিনিধি, বাঁকুড়া: দশমীতে নয়, দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জন হয় খোদ ভাইফোঁটার দিন! বাঁকুড়ার ময়নাপুরের দেওয়ানবাড়ির ৩৭১ বছরের প্রাচীন পুজোয় আজও অম্লান এই শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য। এখানে মা দুর্গা দশভুজা নন, বরং দ্বিভুজা অভয়ারূপে পূজিতা হন। উৎসবের মরসুমে দেওয়ানবাড়ির এই ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিক পুজোকে ঘিরে মেতে উঠেছেন ময়নাপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দারা।
এই পুজোর সূচনা ও রীতির পিছনে জড়িয়ে রয়েছে মল্লরাজ আমলের এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, দেওয়ানবাড়ির পূর্বপুরুষ শরোত্তম রায় বর্ধমানের বীজপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি বর্ধমান রাজার দেওয়ান নিযুক্ত হন। সেই সময় বিষ্ণুপুর ছিল করদ রাজ্য। একবার কর না দেওয়ায় বর্ধমানের রাজা বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাকে চিঠি লেখেন। প্রত্যুত্তরে বিষ্ণুপুরের রাজা একটি সাদা চিঠি পাঠান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বর্ধমানের রাজা বিষ্ণুপুর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
সেই সময় দেওয়ান শরোত্তম রায় মধ্যস্থতা করেন এবং জানতে পারেন যে তীব্র দুর্ভিক্ষের কারণেই বিষ্ণুপুরের রাজা কর দিতে পারেননি। তিনি বর্ধমান রাজকে বুঝিয়ে বিষ্ণুপুরকে আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করেন। এই ঘটনার পর মল্লরাজার সঙ্গে শরোত্তম রায়ের গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে। মল্লরাজা খুশি হয়ে শরোত্তম রায়কে ৬৫টি মৌজার অধিকারী করে দেন, যার মধ্যে ময়নাপুর অন্যতম। এরপর ১৬৫৩ সালে ময়নাপুরে প্রথম তালপাতার ছাউনির নীচে এই পুজোর সূচনা করেন শরোত্তম রায়।
প্রথম বছরের পুজোয় মল্লরাজাকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও, বিশেষ কারণে তিনি আসতে পারেননি। রাজার অপেক্ষায় দশমী পেরিয়ে গেলেও প্রতিমা মণ্ডপেই রেখে দেওয়া হয়। এ ভাবে কেটে যায় লক্ষ্মীপূজা ও কালীপূজাও। পরে রাজা আসতে না পারার জন্য অনুতাপ বার্তা পাঠালে, ভাইফোঁটার দিন প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। সেই থেকে আজও ভাইফোঁটাতেই প্রতিমা নিরঞ্জনের রীতি চলে আসছে।
পরিবারের সদস্য নীলাদ্রিশেখর রায় ও সাত্ত্বিক রায় জানান, মল্লরাজাদের অনুকরণে জিতাষ্টমীর দিন থেকেই দেওয়ানবাড়িতে পুজো শুরু হয়ে যায়। ওই দিন থেকেই ভোগ রান্না করে গ্রামবাসীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়, যা চলে নবমী পর্যন্ত। এই পুজোয় সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত শালকাঠ ও ঘি দিয়ে যজ্ঞকুণ্ড জ্বালানো হয় এবং এক হাজার আটটি বেলপাতা সহযোগে পূর্ণাহুতি দেওয়া হয়। সন্ধিপূজায় এখানে ছাগ বলির রেওয়াজ রয়েছে। পুজোর দিনগুলিতে দেওয়ান পরিবারের সদস্যরা দেশ-বিদেশ থেকে আদিবাড়িতে ফিরে আসেন।

