হট টপিক
দেড়শো বছরের প্রাচীন দাসবাড়ি: রণংদেহী নয়, বর্ধমানে মা পূজিতা শান্ত হরগৌরী রূপে
প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: সময়ের অমোঘ নিয়মে পুরোনো জমিদারি প্রথা আজ ইতিহাসের পাতায় বিলীন। ক্ষয়ে গিয়েছে রাজকীয় দালানকোঠার পলেস্তারাও। তবে বর্ধমান শহরের খাজা আনোয়ার বেড় এলাকার দাসবাড়িতে আজও অমলিন দেড়শো বছরের প্রাচীন দুর্গাপূজার (Durga Puja 2026) ঐতিহ্য। আর পাঁচটা বনেদি ভিটে বা রাজবাড়িতে দেবী মহিষাসুরমর্দিনীর উগ্র ও রণংদেহী রূপের পুজো দেখা গেলেও, দাসপরিবারে উমা আরাধনা করা হয় সম্পূর্ণ অন্য মেজাজে। এখানে দেবী এক্কেবারে শান্ত ও স্নিগ্ধ ‘হরগৌরী’ রূপে ভক্তদের দর্শন দেন।
দাস বংশে এই পুজোর সূচনা করেছিলেন তৎকালীন জমিদার মাখনলাল দাস। প্রথম দিকে অবশ্য মৃণ্ময়ী মূর্তি গড়ার চল ছিল না; কেবল ঘট স্থাপন করেই বৈদিক নিয়মে মা উমার পুজো সম্পন্ন করা হতো। মাখনলালের সুযোগ্য পুত্র ব্রজেন্দ্রলাল দাস ছিলেন বর্ধমানের তৎকালীন মহারাজ বিজয়চাঁদ মহতাবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তবে দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় ব্রজেন্দ্রলালের মনে চরম আক্ষেপ ও গভীর বেদনার সঞ্চার হয়েছিল।
জনশ্রুতি রয়েছে, মনের সেই তীব্র ব্যাকুলতার মাঝেই এক রাতে ব্রজেন্দ্রলালকে স্বপ্নে অলৌকিক দর্শন দেন দেবী। তিনি আদেশ দেন, ঘটের বদলে এবার থেকে হরগৌরী রূপে মৃণ্ময়ী প্রতিমা গড়ে যেন তাঁর পুজো শুরু করা হয়। দেবীর সেই স্বপ্নাদেশ মেনে আরাধনা শুরু করার পরেই অলৌকিকভাবে দাসবাড়িতে পুত্রসন্তানের আগমন ঘটে। দেবীর সেই অপার আনন্দ ও কৃপাকে স্মরণীয় করে রাখতে ব্রজেন্দ্রলাল তাঁর সদ্যজাত সন্তানের নাম রেখেছিলেন ‘দুর্গাচরণ’। সেই থেকে আজ পর্যন্ত মহিষাসুরমর্দিনীর বদলে মহাদেব ও গৌরীর এই শান্ত রূপেরই পুজো হয়ে আসছে বর্ধমানের খাজা আনোয়ার বেড় এলাকার এই ঐতিহাসিক দাসবাড়িতে।
দাসবাড়ির ব্যতিক্রমী প্রতিমার গড়নেও রয়েছে বিশেষ স্বকীয়তা। ঐতিহ্যবাহী একচালার কাঠের কাঠামোয় দেবীর ঠিক ডান পাশে অবস্থান করেন দেবাদিদেব মহাদেব। দুই পার্শ্বে বিরাজ করেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী, আর নীচের অংশে ঠাঁই পান কার্তিক ও গণেশ। পঞ্চমীর দিন থেকেই মণ্ডপে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণে শুরু হয়ে যায় দেবীর নিয়মনিষ্ঠ পুজো। ভোগের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের স্বাদ ও প্রথা আজ অবিকৃত রয়েছে; প্রতিদিন দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয় খাটি গাওয়া ঘিয়ে ভাজা লুচি, কাঁঠালি কলা এবং নারকেলের নানা মিষ্টি। পূর্বে মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোয় ছাগবলির প্রথা চালু থাকলেও প্রায় ৮০ বছর আগে তা চিরতরে রদ করা হয় এবং তার জায়গায় স্থান পায় বিশেষ মণ্ডা বলির রীতি। জমিদারির বৈভব হারিয়ে দাস পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ বদলালেও দেবীর ভক্তি ও পূজার্চনার নিখাদ নিয়মে কোনো খামতি আসেনি।

