হট টপিক
বাঙালির মৎস্য-বিলাসের রূপকার হীরালাল চৌধুরীর প্রয়াণ দিবস আজ
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদন: বাঙালির দুপুরের পাতে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে এক টুকরো রুই কিংবা কাতলার কালিয়া না হলে যেন ভোজনটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু আজকের এই সহজলভ্য মাছের প্রাচুর্য কি চিরকাল এমন ছিল? উত্তর হলো— না। একটা সময় ছিল যখন নদী-নালা বা পুকুর থেকে প্রাকৃতিকভাবে সংগৃহীত মাছের ডিম পোনার ওপরই নির্ভর করতে হতো গোটা দেশের মৎস্য চাষকে। জোগান ছিল কম, আর সেই তুলনায় চাহিদা ছিল আকাশছোঁয়া। বাঙালির মৎস্য-বিলাসের এই চিরকালীন সংকটকে এক লহমায় দূর করেছিলেন যিনি, তিনি হলেন প্রখ্যাত মৎস্য বিজ্ঞানী ডঃ হীরালাল চৌধুরী। আজ, ১২ সেপ্টেম্বর, ভারতের ‘নীল বিপ্লবের’ এই অন্যতম কাণ্ডারীর প্রয়াণ দিবস। ২০১৪ সালের আজকের দিনেই কলকাতার সল্টলেকে ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই বিজ্ঞানী। স্বতন্ত্র খবর তাঁকে আন্তরিক শ্রদ্ধা জানায়।
সায়েন্সের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘প্রণোদিত প্রজনন’ বা ‘হাইপোফাইজেশন’, তার সফল প্রয়োগ ঘটিয়ে ডঃ হীরালাল চৌধুরী ভারতের মৎস্য চাষের ইতিহাসকে চিরদিনের মতো বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ওপর ভর করেই আজ ভারত মাছ উৎপাদনে বিশ্বের প্রথম সারিতে উঠে এসেছে।
ডঃ হীরালাল চৌধুরীর জন্ম ১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর অবিভক্ত ভারতের আসামের শ্রীহট্টের (অধুনা বাংলাদেশের সিলেট জেলা) কুবাজপুর গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী হীরালাল ১৯৩৬ সালে সিলেটের গোমস স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতার শতাব্দীপ্রাচীন বঙ্গবাসী কলেজ থেকে ১৯৪১ সালে বি.এসসি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৪৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে প্রাণিবিদ্যায় (জুলজি) স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
দেশভাগের পর ওপার বাংলা থেকে এপারে চলে আসার পর শুরু হয় তাঁর আসল লড়াই। ১৯৫৪ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালবামা অঙ্গরাজ্যের বিখ্যাত অবার্ন ইউনিভার্সিটিতে মৎস্য ব্যবস্থাপনার ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। সেখানে অধ্যাপক এইচ. এস. সুইঙ্গেলের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করে ১৯৫৫ সালে এম.এস ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার মূল বিষয়ই ছিল— মাছের প্রজননে পিটুইটারি গ্রন্থির নির্যাসের প্রভাব। আমেরিকা থেকে ফিরে এসে ১৯৬১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং পরবর্তীতে ডি.এসসি ডিগ্রি লাভ করেন এই কৃতি বাঙালি।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর দেশের খাদ্য সংকট দূর করা ছিল জওহরলাল নেহেরু সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই সময়ে ভারতের নদী বা পুকুরে কার্প জাতীয় মাছ (রুই, কাতলা, মৃগেল) প্রাকৃতিকভাবে ডিম পাড়ত না, কেবল নদীর প্রবহমান স্রোতেই তারা ডিম ছাড়ত। ফলে মৎস্য চাষের জন্য পর্যাপ্ত ডিম পোনা পাওয়া ছিল ভাগ্যের ব্যাপার।
ওড়িশার কটকের ‘সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ (CIFRI)-এর গবেষণাগারে বিজ্ঞানী ডঃ আলিকুনহির সঙ্গে মিলে কাজ শুরু করেন ডঃ হীরালাল চৌধুরী। পিটুইটারি গ্রন্থির হরমোন ইনজেকশন হিসেবে মাছের শরীরে পুশ করে কৃত্রিম উপায়ে বন্দি জলাশয়ে ডিম পাড়ানোর এক অভিনব পরীক্ষা চালান তিনি।
অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন— ১৯৫৭ সালের ১০ জুলাই। ওড়িশার কটকে ল্যাবরেটরির কৃত্রিম পুকুরে সফলভাবে রুই-কাতলা মাছের কৃত্রিম প্রজনন ঘটাতে সক্ষম হন তিনি। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই পদ্ধতিই ‘প্রণোদিত প্রজনন’ (Induced Breeding) নামে খ্যাত। এই একটি আবিষ্কার ভারতের মৎস্য চাষিদের স্বনির্ভর করে তোলে এবং বাজারে মাছের জোগান রাতারাতি বাড়িয়ে দেয়। ডঃ হীরালাল চৌধুরীর এই অবিস্মরণীয় অবদানকে সম্মান জানাতেই ভারত সরকার প্রতি বছর ১০ জুলাই দিনটিকে ‘জাতীয় মৎস্য চাষি দিবস’ (National Fish Farmers' Day) হিসেবে পালন করে আসছে।
ডঃ চৌধুরীর এই গবেষণার ফলেই ভারতে ‘নীল বিপ্লব’ বা ব্লু রেভোলিউশনের সূচনা ঘটে। কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত ডিম পোনা দেশের কোটি কোটি মৎস্য চাষির ভাগ্য বদলে দেয়। পুকুরে নিবিড় মিশ্র মাছ চাষের (Composite Fish Farming) নতুন দিগন্ত খুলে দেন তিনি, যার ফলে একই পুকুরে একসঙ্গে রুই, কাতলা ও মৃগেল মাছের ফলন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
তাঁর এই মেধার কদর শুধু ভারতে আটকে ছিল না। রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র (SEAFDEC)-এর প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে তিনি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু দেশে মৎস্য চাষের আধুনিকীকরণ করেন। ফিলিপিন্স ও মায়ানমারে তাঁর হাত ধরেই মৎস্য চাষে জোয়ার আসে।
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৬০ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির ‘চন্দ্রকলা হোরা মেমোরিয়াল গোল্ড মেডেল’, ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদের ‘রফি আহমেদ কিদওয়াই পুরস্কার’, ১৯৯৪ সালে বিশ্ব অ্যাকুয়াকালচার সোসাইটির দেওয়া সম্মানসূচক লাইফ মেম্বারশিপ এগুলির মধ্যে অন্যতম।
বিজ্ঞান সাধনার পাশাপাশি ডঃ চৌধুরী ছিলেন আপাদমস্তক এক মাটির মানুষ। সল্টলেকের বাড়িতে শেষ জীবন কাটানোর সময়েও নতুন প্রজন্মের গবেষকদের নিয়মিত উৎসাহ জুগিয়ে যেতেন তিনি। আজকের দিনে যখন জলবায়ু পরিবর্তন এবং নদীদূষণের কারণে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলি ক্রমশ ধ্বংসের মুখে, তখন ডঃ হীরালাল চৌধুরীর কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তিই বিশ্বজুড়ে মাছের বংশ টিকিয়ে রেখেছে। প্রয়াণ দিবসে বাংলার এই মহান বিজ্ঞানীকে স্বতন্ত্র খবর বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।

