বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
হট টপিক

পুজোর ছুটিতে একদিনের সফর, চলুন ইতিহাসের নাড়াজোল

প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর, ২০২৬
পুজোর ছুটিতে একদিনের সফর, চলুন ইতিহাসের নাড়াজোল
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

নিজস্ব প্রতিনিধি, মেদিনীপুর: দুর্গাপুজো এসে গেল বলে। গ্রামবাংলা জুড়ে এখন দোলা দিচ্ছে শ্বেতশুভ্র কাশফুল। নীল আকাশে উঁকি দিচ্ছে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেলা। এমন মোহময় দিনে চার দেওয়ালের মধ্যে খাঁচাবন্দি হয়ে ঘরে বসে থাকতে কারই বা মন চায়! কিন্তু অনেকেরই ব্যস্ততার কারণে দূরে কোথাও যাওয়ার অবকাশ বা সময় থাকে না। ছুটি বলতে হয়তো হাতে কেবল একটা বা দুটো দিন। তা হলে কী করবেন? মন খারাপ করার কোনও কারণ নেই। পুজো শুরুর এই আবহে আপনার মনকে চাঙ্গা করতে শহরের খুব কাছেই অপেক্ষা করছে এক অপরূপ ঐতিহাসিক গন্তব্য। চলুন পশ্চিম মেদিনীপুরের নাড়াজোল। এক পাশে যেখানে শান্ত পায়ে বয়ে চলেছে কংসাবতী, অন্য পাশে তার রূপের ডালি নিয়ে হাজির শিলাবতী। ইতিহাস, রাজবাড়ি, শতাব্দীপ্রাচীন জরাজীর্ণ মন্দির আর খাঁটি গ্রামবাংলার মায়াবী পরিবেশ— সব কিছুর নিখুঁত কোলাজ পাওয়া যাবে মাত্র একদিনের এই চটজলদি সফরে।

নাড়াজোলের ভৌগোলিক অবস্থান একে বাকি পাঁচটা চেনা পর্যটন কেন্দ্রের থেকে আলাদা করেছে। কংসাবতী আর শিলাবতী নদীর মধ্যবর্তী এই ভূখণ্ডে পা রাখলেই এক ধাক্কায় যেন কয়েকশো বছর পিছিয়ে যাওয়া যায়। নাড়াজোল রাজবাড়ির ইতিহাস কিন্তু আজ-কালের নয়, তা প্রায় ৬০০ বছরের পুরনো। আনুমানিক চতুর্দশ শতকে উদয়নারায়ণ ঘোষ নামে এক ব্যক্তি এই রাজবংশের পত্তন করেছিলেন। পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে এই বংশের শাসক বলবন্ত সিংহ রায় মুঘলদের থেকে ‘খান’ উপাধি পান, যা পরবর্তীতে তাঁদের পারিবারিক পদবীতে পরিণত হয়। ফলে এই বংশের রাজারা ‘হিন্দু খান’ নামেও ইতিহাসে বেশ পরিচিত।

শুধু রাজকীয় জাঁকজমকই নয়, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গেও এই নাড়াজোল রাজবাড়ির যোগ রয়েছে অত্যন্ত নিবিড়। এক সময় এই রাজপ্রাসাদ ছিল বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা। রাজা নরেন্দ্রলাল খান বিপ্লবীদের অর্থসাহায্য করতেন, যাঁর জন্য তাঁকে ব্রিটিশদের হাতে গ্রেপ্তারও হতে হয়েছিল। এই রাজবাড়িতে বিভিন্ন সময়ে পা রেখেছেন মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ক্ষুদিরাম বসু, জওহরলাল নেহেরু, এমনকি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের মতো যুগপুরুষেরা। তাই এখানকার দেওয়ালে দেওয়ালে আজও যেন সেই গৌরবময় অধ্যায়ের ফিসফিসানি শোনা যায়।

কী কী দেখবেন নাড়াজোলে?

এখানে দেখার মতো রয়েছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অজস্র প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। পুরো নাড়াজোল ও লঙ্কাগড় এলাকা মিলিয়ে প্রায় ৩৬০ বিঘা জমির ওপর এই রাজত্ব বিস্তৃত ছিল।

• নাড়াজোল রাজবাড়ি (অন্দরমহল ও বহিরমহল): নাড়াজোলের প্রধান আকর্ষণ হলো এখানকার মূল রাজপ্রাসাদ। প্রায় ৬০ বিঘা জমির ওপর পরিখা দিয়ে ঘেরা এই তিনতলা রাজবাড়িতে এক সময় ২৫০টি ঘর ছিল। প্রাসাদের ভেতরে রয়েছে একটি চোখধাঁধানো নাচঘর বা ‘হাওয়া মহল’। সাধারণত এই রাজবাড়ির দরজা সাধারণের জন্য সবসময় খোলা থাকে না, তবে পুজোর দিনগুলিতে গেলে এই রাজবাড়ির অন্দরমহল খুব কাছ থেকে ঘুরে দেখার এক দুর্লভ সুযোগ মেলে। রোমান ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের ছোঁয়া মাখানো এই প্রাসাদের সিংহদুয়ার ও থামগুলি আজও দর্শকদের আকৃষ্ট করে।

• শতাব্দীপ্রাচীন মন্দিরের সারি: রাজবাড়ি চত্বরে এবং তার আশেপাশে প্রায় ৫৪টি ছোট-বড় প্রাচীন মন্দির রয়েছে, যার সিংহভাগই ৪৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো। এর মধ্যে আটচালা বিশিষ্ট রাজবাড়ির নিজস্ব দুর্গাদালান, মহামৃত্যুঞ্জয় শিব মন্দির, সীতারামজিউর মন্দির এবং নবরত্ন গোবিন্দজিউর মন্দির অন্যতম। প্রতিটি মন্দিরের গায়ে টেরাকোটা ও প্রাচীন বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়।

• পঁচিশ চূড়ার অনন্য রাসমঞ্চ: রাজবাড়ির ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এক ঐতিহাসিক রাসমঞ্চ। বাংলার মন্দির স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন এই রাসমঞ্চের মাথায় রয়েছে ছোট-বড় ২৫টি চূড়া। এর সামনেই রাখা থাকে একটি বিশাল কাঠের রথ। প্রতি বছর রথযাত্রার সময় এই রথটিকে নাড়াজোল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে লঙ্কাগড় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয় এবং উৎসব শেষে আবার ফিরিয়ে আনা হয়।

• লঙ্কাগড়ের জলহরি: নাড়াজোল থেকে গাড়ি নিয়ে সামান্য এগিয়ে গেলেই পৌঁছানো যায় লঙ্কাগড়ে। পথে সঙ্গী হবে রূপসী শিলাবতী নদী। লঙ্কাগড়ের মূল আকর্ষণ হলো ‘জলহরি’ বা রাজাদের গ্রীষ্মকালীন প্রমোদ উদ্যান। প্রায় ১০০ বিঘা বিস্তৃত এক বিশাল দীঘির ঠিক মাঝখানে তৈরি করা হয়েছিল এই জলমহল বা আউটহাউস। চারদিকে জলরাশি আর মাঝখানে জরাজীর্ণ হলেও এক অপরূপ সুন্দর প্রাচীন ইমারত। যদিও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জলহরি আজ অনেকটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত, তবুও এর মায়াবী সৌন্দর্য ফটোগ্রাফার এবং ভ্রমণপিপাসুদের টানে।

গ্রামবাংলার শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ

ইতিহাসের পাতা ওল্টানোর পাশাপাশি এই সফরের অন্যতম উপরি পাওনা হলো খাঁটি গ্রামবাংলার শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ। শহরের কোলাহল ও যান্ত্রিক ব্যস্ততা থেকে দূরে কংসাবতী আর শিলাবতীর চরে দাঁড়িয়ে বুকভরে হাওয়া নেওয়া কিংবা নদীর পাড়ে কাশফুলের দোলা দেখা এক পরম শান্তি এনে দেয়। নদীর শান্ত জলধারা আর দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠের ওপর শরতের রোদের খেলা দেখে আপনার শহুরে ক্লান্তি নিমেষের মধ্যে কর্পূরের মতো উড়ে যাবে।

কীভাবে যাবেন এবং খরচ কেমন?

কলকাতা বা তার আশেপাশের এলাকা থেকে একদিনের সফরে নাড়াজোল যাওয়া অত্যন্ত সহজ।

• রেলপথে: হাওড়া বা শালিমার থেকে মেদিনীপুর বা খড়গপুরগামী যে কোনও লোকাল বা এক্সপ্রেস ট্রেনে চেপে আপনাকে নেমে পড়তে হবে পাংশকুড়া স্টেশনে। পাংশকুড়া স্টেশন থেকে নাড়াজোলের দূরত্ব সড়কপথে মাত্র ৩৫ কিলোমিটারের কাছাকাছি। স্টেশন চত্বর থেকেই আপনি টোটো, অটো কিংবা গাড়ি ভাড়া করে অনায়াসে পৌঁছে যেতে পারেন গন্তব্যে।

• সড়কপথে: যদি নিজেদের গাড়িতে বা বাইকে যেতে চান, তবে কলকাতা থেকে কোলাঘাট হয়ে জাতীয় সড়ক ধরে সরাসরি পাংশকুড়া চলে আসুন। সেখান থেকে রাজ্য সড়ক ধরে দাসপুর-১ ব্লকের অন্তর্গত ঘাটাল মহকুমার এই নাড়াজোল গ্রামে পৌঁছানো যায়। কলকাতা থেকে সড়কপথে এর মোট দূরত্ব প্রায় ১১৫ থেকে ১২০ কিলোমিটার। সকালে রওনা দিলে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।

• খরচ ও আনুষঙ্গিক তথ্য: নাড়াজোল ঘোরার জন্য কোনও চড়া প্রবেশমূল্যের প্রয়োজন হয় না। বিভিন্ন মন্দির বা দর্শনীয় স্থানগুলি দেখার জন্য স্থানীয় গাইডদের সাহায্য নিতে পারেন, যাঁর জন্য সামান্য কিছু খরচ হতে পারে। তবে মাথায় রাখবেন, এটি পুরোপুরি একটি গ্রামীণ এলাকা হওয়ায় এখানে থাকার মতো বড় কোনও লাক্সারি হোটেল বা রিসর্ট নেই। তাই ডে-ট্রিপ বা একদিনের সফরের জন্যই এই জায়গাটি সবচেয়ে আদর্শ। রাজবাড়ি ও আশেপাশের এলাকায় ঘোরার পাশাপাশি দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার জন্য স্থানীয় ছোট হোটেল বা ঘাটাল শহরের রেস্তোরাঁগুলির ওপর নির্ভর করতে হবে।