নবদুর্গার চন্দ্রঘন্টারূপ
মা দুর্গার নয়টি রূপ—নব দুর্গা। ৯দিন বা রাত ধরে তাঁর যে পূজা হয়, শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে নবমী তিথি পর্যন্ত-এর প্রতিদিন মাকে এক এক রূপে দেখা হয়। শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী,চন্দ্রঘন্টা,কুষ্মাণ্ডা,স্কন্দমাতা, কাত্যায়নী , কালরাত্রি,মহাগৌরী,সিদ্ধিদাত্রী। আমাদের রাজ্যে শরৎকালে এই যে দুর্গাপূজা তা প্রধানত শেষ চারদিনের। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত। মায়ের এই নয়রূপের মধ্যে লুকিয়ে আছে সাধনার নয়টি স্তর। শৈলপুত্রী থেকে শুরু করে একে একে সিদ্ধিদাত্রী পর্যন্ত। আজ নবরাত্রির তৃতীয়া তিথিতে মা চন্দ্রঘন্টা রূপে পূজিতা। সাধনার এই স্তরে সাধকের জ্যোতি দর্শন হয়। আর ঘন্টার ধ্বনি শোনা যায় যেটা বাইরে থেকে নয়, শরীরের মধ্যে থেকেই আসছে। এটাই নাদ ধ্বনি। নাদ বলতে আমরা সাধারণত বুঝি শব্দ, কিন্তু এই শব্দকে দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনুভব করি কানের পর্দায় বিভিন্ন তরঙ্গের মাধ্যমে। এই শব্দ তরঙ্গ প্রবাহিত হয় হাওয়ার মধ্য দিয়ে। বিজ্ঞানীরা দেখছেন, মহাজাগতিক স্তর থেকেও এক ধরনের শব্দ এসে পৌঁছয় পৃথিবীতে, যদিও মহাবিশ্বে কোন হওয়া নেই। এই শব্দ সাধারণ মানুষেরা শুনতে পায় বিশেষ মাধ্যমে। শরীরের মধ্যেও বহু চক্র রয়েছে যা তরঙ্গের সৃষ্টি করে এমনকি মনের চিন্তা গুলিও। মনে যে ভাব ওঠে সেটাই চিন্তার তরঙ্গ তোলে। এভাবে মনেও বিভিন্ন নাদ উঠছে। এই জ্যোতি বা চন্দ্র ও নাদ বা ঘন্টা দুই অনুভূতি লাভ করেন সাধক। এজন্যই সাধনার এই স্তরকে চন্দ্রঘন্টা বলা হয়েছে। প্রতিটি ইন্দ্রিয়ের নিজস্ব শক্তি আছে। যেমন চোখের মধ্য দিয়ে দর্শন শক্তি, কানের মধ্য দিয়ে শ্রবণ শক্তি প্রকাশিত হয়। সাধনার সময় ইন্দ্রিয়গুলিকে অন্য কাজে লাগানো হয় না। তখন ওই মূল শক্তিকে অনুভব করা যায় তেজপুঞ্জ বা জ্যোতি হিসাবে। এটাই জ্যোতি দর্শন। আসল কথা, মনই দেখা,শোনা, স্বাদ ইত্যাদির মূলকর্তা। অর্থাৎ মনের সঙ্গে সংযোগ থাকলেই ইন্দ্রিয়গুলি কাজ করতে পারে। সাধনার সময় যখন একাগ্রচিত্তে জপ ধ্যান করা হয় তখন বাইরের পরিবেশ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং ইন্দ্রিয়গুলি তখন কর্মরত থাকে না, নিজের সত্তা হিসেবে তখন মনই সক্রিয় থাকে । তখন ওই মনকে আমরা অনুভব করি তেজ হিসাবে বা জ্যোতি রূপে। চন্দ্র ঘন্টা শব্দের তাৎপর্য হলো এই যে, চৈতন্যময়ী মা-ই প্রকাশিত হচ্ছেন নানাভাবে, সাধনার এই স্তরে চন্দ্রঘন্টা রূপে।

