বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
হট টপিক

উজ্জ্বল হালদারের কবিতা : সহজ মানুষ জলের স্বপ্নে বাঁচে 

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
উজ্জ্বল হালদারের কবিতা : সহজ মানুষ জলের স্বপ্নে বাঁচে 
সুরজিৎ প্রামাণিক (পিএইচ.ডি. গবেষক, বাংলা বিভাগ, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, শিলচর)
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

সংহত চরণের ভেতর অস্তিত্বের অতলান্তিক সত্যকে ধরে রাখার নিবিড় মননশীল প্রয়াস উজ্জ্বল হালদারের কবিতা। ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার নেতড়ায় তাঁর জন্ম। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত কবিতার বই দু’টি, ‘উঠোন ও ঘরদোরের কবিতা’ (২০২৪) এবং ‘কথায় আঁকা কলমকারি’ (২০২৫)। তাঁর কাব্যে শব্দের অপচয় নেই; পরিমিত শব্দের আড়ালে সমকালীন মানুষের দ্বিধা, সম্পর্কের জটিলতা, ক্ষরণ ও নিঃসঙ্গতাকে গভীরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন উজ্জ্বল। আপাতদৃষ্টিতে তাঁর পংক্তিগুলো সহজ ও নিটোল মনে হলেও, গভীরে প্রবেশ করলে উন্মোচিত হয় অন্তর্লীন দ্বান্দ্বিকতা— যেখানে প্রেম হয়ে ওঠে রোমান্টিক আবেগ এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সচেতন লড়াই; যেখানে ঈশ্বর কোনো বিমূর্ত স্বর্গীয় সত্তা না হয়ে, হয়ে ওঠে মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতার ক্ষণস্থায়ী প্রকাশ; আর মানবসম্পর্কের দূরত্ব যাবতীয় লৌকিক ব্যবধান ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে মহাজাগতিক স্তব্ধতার মতো। উচ্চকিত হাহাকারে ভেসে না গিয়ে, মানুষের ভেতরের দ্বৈততা ও অবক্ষয়কে নির্মোহ দৃষ্টিতে ব্যবচ্ছেদ করেন তিনি। মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনা, আশ্বাসের মরীচিকা এবং শেকড়হীন জীবনের সংকটকে অত্যন্ত কঠিন ও নিরাসক্ত ভাষায় প্রত্যক্ষ করে, পাঠককে নিঃশব্দ আত্মবিশ্লেষণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন কবি উজ্জ্বল হালদার।

উজ্জ্বলের কবিতা বাহ্যিক অবয়বে অত্যন্ত সংহত হলেও এর দার্শনিক বিস্তার ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা অত্যন্ত জটিল। তিনি যে জীবনচেতনাকে ধরেতে চান, তা কোনো আকস্মিক ভাবোচ্ছ্বাস নয়, অস্তিত্বের দীর্ঘ পরিভ্রমণ ও অভিজ্ঞতার নির্যাস। সাধারণত ভালোবাসা কিংবা মানবসম্পর্ককে মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত বা অনায়াসলব্ধ আবেগ হিসেবে গ্রহণ করতেই অভ্যস্ত; কিন্তু উজ্জ্বল সেই ধারণার বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে ভালোবাসাকে দেখেছেন সচেতন চৈতন্যের সাধনা বা অনুশীলনের ফলিত রূপ হিসেবে। তাই লেখেন,
‘পায়ে পায়ে পথ, পথে পথে মুখ’ 
এই গতিশীল পার্থিব পরিভ্রমণের চিত্রপট ভৌগোলিক ও শারীরিক দূরত্ব অতিক্রম করে, কাল ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মানুষের নিরন্তর বয়ে চলা। পথ কোনো বিচ্ছিন্ন ধারণা নয়। পথের সমান্তরালে ফুটে ওঠে বহু মানুষের অবয়ব, তাদের দৃষ্টি ও সান্নিধ্য। ‘পথে পথে মুখ’ জীবনের ভিড়, সামাজিক যোগাযোগ ও সম্পর্কের বিচিত্র সম্ভাবনাকে ফুটিয়ে তোলে। এই মুখগুলো শুধুই পারিপার্শ্বিক দৃশ্য নয়, এদের প্রতিটি সত্তাই মানুষের আত্মচেতনার ওপর কোনো না কোনোভাবে দাগ কেটে যায়। সম্পর্কের বহুত্ব ও মানুষের চিরন্তন চলাচলের ভেতর দিয়ে ব্যক্তিমানুষ আসলে কী সন্ধান করে, সেই জিজ্ঞাসাই যেন অন্তঃসলিলা রূপে প্রবাহিত হয় উজ্জ্বলের কবিতায়। বিচ্ছেদ ও তার অবশেষের অতলান্তিক সত্যকে উন্মোচন করেন কবি, 
‘চলে গিয়ে কেউ রেখে গেছে রেশ’
মানুষের জীবনে কোনো মানুষই চিরস্থায়ী নয়; প্রস্থানের অনিবার্য নিয়তি সর্বদাই সম্পর্কের গায়ে ছায়া ফেলে রাখে। কিন্তু কবির কাছে সেই প্রস্থান চূড়ান্ত শূন্যতা তৈরি করে না। চলে যাওয়ার পরও থেকে যায় তার ‘রেশ’। এই রেশ স্মৃতি, বিষাদ কিংবা একটি অলক্ষ্য চেতনার আলোড়ন। অস্তিত্ববাদী দর্শনের নিরিখে অনুপস্থিতি নিজেই যখন প্রচণ্ড উপস্থিতিতে রূপান্তরিত হয়, ঠিক তখনই জন্ম নেয় এই সূক্ষ্ম অবশেষ। যে চলে গেছে, সে হয়তো শারীরিকভাবে অনুপস্থিত, কিন্তু তার ফেলে যাওয়া শূন্যস্থানটি ব্যক্তির আত্মাকে নিঃস্ব না করে, পরবর্তী উপলব্ধির জন্য প্রস্তুত করে তোলে। অতীত সম্পর্কের বিচ্ছেদ মানুষের মধ্যে যে ক্ষতের সৃষ্টি করে, সেই ক্ষত থেকেই এক ধরনের বোধের উন্মেষ ঘটে— যা শূন্যতার প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। আর সেই প্রতিষেধক নিয়েই উজ্জ্বল লেখেন,
‘কেউ কেউ আছে বলে 
ভালোবাসা করেছি অভ্যেস।’ 
‘অভ্যেস’ কোনো জড়তা বা আবেগহীন গতানুগতিকতা নয়; তা আঘাত, ক্ষয় ও বিচ্ছেদের পরেও টিকে থাকার সচেতন ও কঠিন লড়াই। যাবতীয় বিচ্ছেদ-বেদনার বিপরীতেও যখন অবশিষ্ট কেউ আছে, তখন সেই টিকে থাকা মানুষের উপস্থিতি ব্যক্তিকে পরম নির্ভরতা দেয়। সেই অল্প সংখ্যক মানুষের অস্তিত্বই জীবনকে ভালোবাসার উপযুক্ত করে তোলে। তবে ভালোবাসা কোনো আকস্মিক আবেগীয় অভিঘাত নয়, তা বারবার চর্চার মাধ্যমে আয়ত্ত করা মানবিক প্রতিরক্ষার মতো। বিচ্ছেদের যন্ত্রণা যখন হৃদয়কে আড়ষ্ট বা নিঃসাড় করে দিতে চায়, তখন পারিপার্শ্বিকের কিছু ইতিবাচক উপস্থিতি মানুষকে নতুন করে বাঁচার তাগিদ এনে দেয়। কবি সেই তাগিদ থেকেই ভালোবাসাকে নিয়মিত চর্চা বা স্বভাবে পরিণত করেন। প্রেমকে অভ্যাসে রূপান্তরিত করা আসলে আবেগের উচ্চতর পর্যায়, যেখানে ভালোবাসার জন্য কোনো সাময়িক প্রেরণার প্রয়োজন পড়ে না; তা জীবনের শ্বাস-প্রশ্বাসের মতোই স্বাভাবিক ও অবিচ্ছেদ্য ধর্মে পরিণত হয়।
সংহত ভাষা, পরিমিত শব্দচয়ন এবং আবেগহীন গভীরতার কারণেই উজ্জ্বলের কবিতা আত্মবিশ্লেষণের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। তিনি কোনো উচ্চকিত হাহাকার প্রকাশ করেননা, কিংবা কোনো কৃত্রিম আশাবাদের মায়াজালও বোনেননা। তিনি অত্যন্ত নিরাসক্ত অথচ মমতাময় দৃষ্টিতে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও সম্পর্কের রূপান্তরকে স্বীকার করে নিতে পারেন। ফলে তাঁর কবিতা কেবল ভালোবাসার কবিতা থাকে না, তা হয়ে ওঠে মানুষের একাকীত্ব, যৌথতা, ও আত্মিক পুনর্গঠনের সংহত রূপ। কবিতার মর্মমূলে কঠিন জীবনসত্যের স্থায়ী অভিঘাত রেখে যায় তিনি। মানবজীবনের সংকট, বঞ্চনা, মানুষের টিকে থাকার পরাবাস্তব প্রবৃত্তির অবয়বকে দার্শনিক আলোয় উন্মোচন করেন। তাই তাঁর কবিতার অন্তর্নিহিত সুর একাধারে অত্যন্ত কঠোর ও মমত্বময়, 
‘কেউ দেয় না পিপাসার জল 
মরে যাওয়া স্বপ্নের মুখে’ 
মানুষের আত্মিক আকুলতা, সহানুভূতি এবং অপূর্ণ বাসনার সঞ্জীবনী শক্তির রূপক হয়ে ওঠে এই পিপাসার জল। অথচ সমাজ বা পারিপার্শ্বিকতার কাছ থেকে সেই আশ্বাসের এক ফোঁটা জলও কি মেলে! যখন স্বপ্ন মরে যেতে বসে, সেই অন্তিম মুহূর্তেও মানুষের আত্মিক হাহাকার সম্পূর্ণ অনাদৃত ও নিঃসঙ্গই থেকে যায়। এই অবহেলা ও অনীহার ভেতর দিয়ে কবি মানুষের চিরন্তন পরমুখাপেক্ষিতা ও তার অবশ্যম্ভাবী ব্যর্থতাকে অত্যন্ত তীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলেন। ‘তবুও সহজ মানুষ জলের স্বপ্নে বাঁচে।’ এ যেন এক ট্র্যাজিক সত্য। কবির দৃষ্টিতে মানুষ ‘সহজ’; এই সারল্য কি তাহলে অজ্ঞতা! ন, তা নয়, এই সারল্য আসলে নির্মম বাস্তবতাকে জেনেও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মৌলিক জৈবিক ও মানসিক প্রতিরোধ। তৃষ্ণার্ত ঠোঁটে যখন বাস্তব জলের স্পর্শ দুর্লভ, তখন মানুষ আশ্রয় নেয় কল্পনার অবগাহনে। স্বপ্ন যেখানে মারা যাচ্ছে, সেখানে মানুষ আরও একটি ‘জলের স্বপ্ন’ নির্মাণ করেই শ্বাস-প্রশ্বাস সচল রাখতে চায়। তাই মরীচিকার মায়ায় বেঁচে থাকার এই প্রবণতা একদিকে যেমন মানুষের চূড়ান্ত অসহায়ত্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, অন্যদিকে তেমনি উন্মোচন করে তার অপরাজেয় অস্তিত্বের রহস্য। স্বপ্নের মৃত্যু হলেও মানুষ স্বপ্নের ধারণাকে মরে যেতে দেয় না; এই পরাবাস্তব আত্মপ্রবঞ্চনাই আসলে মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে। সেই অবলম্বন থেকেই উজ্জ্বল তাঁর কবিতায় প্রকৃতি ও মানবচরিত্রের তুলনামূলক ব্যবচ্ছেদ ঘটিয়ে আধুনিক মানুষের অন্তর্জগতের গভীর সংকটকে চিহ্নিত করেন। তাঁর কবিতার ভাষায় উচ্চকিত ক্রন্দন বা শোকোচ্ছ্বাসের পরিবর্তে রূপ নেয় স্তব্ধ, আত্মমগ্ন ও দার্শনিক দীর্ঘশ্বাস, 
‘গাছ আকাশের দিকে মুখ তুলে থাকে 
অথচ মাটির নিচে শেকড়ের সংসার’ 
বৃক্ষ আসলে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব ভিত্তির মেলবন্ধন। আকাশের দিকে মুখ তুলে থাকলে অনন্তের বিস্তার ও আলোর প্রতি সমর্পণ আসে; কিন্তু এই ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা শিকড়হীন নয়। মাটির অতল অন্ধকারে তার যে শেকড়ের সংসার, তা-ই তাকে স্থায়িত্ব দেয়, পুষ্টি জোগায় এবং অভয় দেয় ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে থাকার। বৃক্ষ তার শিকড় ও শাখার মধ্যে কোনো সংঘাত তৈরি না করে, মাটিকে আঁকড়ে ধরেই সে আকাশের দিকে হাত বাড়াতে থাকে। এই ভারসাম্যের বিপরীতে দাঁড়িয়েই আধুনিক মানুষের চূড়ান্ত আত্মিক বিচ্যুতি, ‘মানুষ কেন যে গাছ হতে পারে না!’ এই প্রশ্ন জাগে। মানুষ ঊর্ধ্বাকাশে উড়তে চায়, সীমাহীন উচ্চাশার পেছনে ছোটে, অথচ নিজের অস্তিত্বের শিকড় বা মৌলিক মাটিকে ভুলে যায় সহজেই। ফলে সামান্য বাতাসের ধাক্কাতেই তার তৈরি ভিত্তি চূর্ণবিচূর্ণ হয়। আবার উল্টোদিকে, মানুষ পার্থিব মায়ার সংকীর্ণতায় এতটাই আবদ্ধ হয়ে পড়ে যে, আকাশের দিকে মুখ তুলে দেখার উদারতাটুকুও সে হারিয়ে ফেলে। বৃক্ষের মতো মহাজাগতিক ব্যাপ্তি ও মাটির অন্ধকারের সঙ্গে একই সাথে ছন্দ মিলিয়ে চলার যে প্রজ্ঞা, আত্মকেন্দ্রিক মানুষ তা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। গাছের আত্মস্থ অস্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কবি মানুষের এই বিচ্ছিন্নতা ও অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যহীনতাকেই চিহ্নিত করেন, আর সেখানেই তাঁর কবিতা সামগ্রিক মানব-সংকটের নীরব আর্তনাদে পর্যবসিত হয়। সেই আর্তনাদ থেকেই আধ্যাত্মিকতা, সমাজবাস্তবতা ও আধুনিক মনস্তত্ত্বের দ্বন্দ্বমুখর সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে কবিতা লেখেন তিনি। ঈশ্বর যেখানে প্রচলিত ধর্মতত্ত্বে চিরন্তন ও অনাদি, কবি সেখানে তাঁর ‘জন্ম’ প্রত্যক্ষ করার কথা বলেন। এই রূপান্তর আসলে ঈশ্বরকে বিমূর্ত স্বর্গীয় ধারণার বাইরে মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম ও মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনের স্তরে স্থাপন করে। কবি লেখেন, 
‘নাস্তিক বিশ্বাসে ছানি পড়া চোখে’
সংশয় বা ঈশ্বরহীনতার বোধ যখন অনমনীয় গোঁড়ামিতে রূপ নেয়, তখন তা দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে, যা কবির ভাষায় ‘ছানি পড়া চোখ’। যে চোখ প্রচলিত বিশ্বাসের বাইরে কিছু দেখতে পায় না, কিংবা যুক্তি দিয়ে সবকিছু খণ্ডন করতে গিয়ে মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক আর্তিটুকু অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, সেই দৃষ্টিভঙ্গির ওপরেই যেন সূক্ষ্ম আঘাত হেনেছেন কবি উজ্জ্বল হালদার। তাঁর কবিতায় মেটাফিজিক্যাল বিমূর্ততা থেকে ছিটকে পড়ে রুঢ় ও স্পন্দিত সামাজিক বাস্তবতা, 
‘ট্রেনের কামরায় অন্ধ ভিখারির হাতে হাতে 
ঈশ্বরকে জন্মাতে দেখি।’ 
ট্রেনের কামরায় আধুনিক নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা, ঔদাসীন্য ও চলমান একাকীত্বের নিখুঁত রূপ ফুটে ওঠে। সেই যান্ত্রিক কোলাহলের ভেতর যখন দৃষ্টিহীন ভিখারি হাত পাতে, তখন সেই প্রসারিত হাতের শূন্যতার ভেতরেই ঘটে অদ্ভুত রূপান্তর। যে সহমর্মিতা বা করুণাবশত অপরিচিত মানুষ অন্য এক বিপন্ন মানুষের শূন্য তালুতে কিছু তুলে দেয়, কিংবা অন্ধ ভিখারিটি যে অদম্য নির্ভরতায় অদৃষ্টের কাছে নিজের ক্ষুধার্ত হাত মেলে ধরে— সেই ক্ষণটিতেই ঈশ্বরের নবজন্ম ঘটে। কবি মনে করেন, ঈশ্বর কোনো মন্দির বা ধর্মগ্রন্থের নিরাপদ প্রাচীরে বেঁচে থাকেন না; তিনি জন্ম নেন মানুষের চরম অসহায়তায়, আবার সেই অসহায়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অপর মানুষের জেগে ওঠা তাৎক্ষণিক সংবেদনে। নাস্তিক্যবাদী যুক্তির যে ‘ছানি’, তা মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতা ও অনুকম্পার মুহূর্তে এসে খসে পড়ে। ফলে উজ্জ্বলের কবিতায় ঈশ্বর হয়ে ওঠেন মানুষের তৈরি মানবিক আশ্রয়, তীব্র সংকটের মুহূর্তে একজন মানুষের প্রতি অন্য মানুষের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অলৌকিক শক্তিতে যা টিকে থাকে। আবার দুই ব্যক্তিমানুষের মধ্যবর্তী মানসিক ব্যবধানকে মহাজাগতিক ব্যাপ্তির সঙ্গে তুলনা করে নিঃসীম শূন্যতাবোধের অবতারণা করেন কবি। মানবসম্পর্কের শীতলতা ও বিচ্ছেদকে কবি কোনো সাধারণ ক্ষোভ বা আবেগের মাপকাঠিতে বিচার করেননি, বরং তাকে উন্নীত করেছেন স্থান ও কালের অতলান্তিক পরিসরে। সম্পর্কের বিচ্ছেদকে তিনি চিহ্নিত করেন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দুটি ভিন্ন গোলার্ধের রূপকে, 
‘মানুষ যে পথে দূরে চলে গেছে 
আরেক মানুষের পৃথিবী থেকে’
কবি, মানুষের অস্তিত্বকে কেবল একটি শরীর হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন আস্ত এক একটি ‘পৃথিবী’ হিসেবে। যখন একজন মানুষ অন্য মানুষের এই ব্যক্তিগত পৃথিবী থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, তখন তাদের মধ্যবর্তী শূন্যতা আর কোনো সাধারণ পথের দূরত্ব থাকে না; তা হয়ে ওঠে দুই গ্রহ বা নক্ষত্রের মধ্যবর্তী মহাশূন্যের মতো নিঃশব্দ অন্ধকারের বিস্তার। মহাজাগতিক ট্র্যাজেডির রূপ নেয় এই পার্থিব দূরত্ব, ‘সেই পথ পাড়ি দিতে মাঝে দু-এক বার/ বিশ্রাম খোঁজে মৃত তারার আলো।’ আমরা জানি যে, আকাশে আমরা যেসব তারার আলো দেখি, তাদের অনেকেই কোটি কোটি বছর আগেই নিভে গেছে; কেবল সেই মৃত তারার আলো যুগ যুগ ধরে অনন্ত মহাশূন্যের ভেতর দিয়ে পথ অতিক্রম করে চলেছে। মানুষের বিচ্ছিন্নতার পথটিকে কবি এতটাই অসীম ও নিঃসঙ্গ বলে কল্পনা করেছেন যে, ক্লান্তিহীন গতিতে ছুটে চলা ‘মৃত তারার আলো’ পর্যন্ত সেই শূন্যতার ভারে শ্রান্ত হয়ে পড়ে। আলো যেখানে মহাবিশ্বের দ্রুততম শক্তি, সে-ও যদি মানুষের দূরত্বের পথ পেরোতে গিয়ে পথিমধ্যে ‘বিশ্রাম খোঁজে’, তবে মানুষের আত্মিক নিঃসঙ্গতার বিস্তার ঠিক কতটা গভীর, তা আর পরিমাপের অবকাশ থাকে কি! তাই মৃত নক্ষত্রের আলো যেমনি এক অতীত অস্তিত্বের শেষ চিহ্ন বয়ে নিয়ে চলে, সম্পর্কের স্মৃতিও তেমনি দূরত্বের অন্ধকারে ক্লান্ত যাত্রীর মতো বেঁচে থাকে। সম্পর্কের এই অপার হিমশীতল শূন্যতাকে কবি মহাজাগতিক বিষাদের সঙ্গে একাকার করে দিয়ে কবিতাকে অস্তিত্বের পরম স্তব্ধতায় পৌঁছে দিতে চান। সময়ের রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে মানবসম্পর্কের অন্তর্গত অবক্ষয় ও ভণ্ডামির নির্মোহ সমাজতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ ঘটাতে চান কবিতায়। তাই তাঁর কবিতা আধুনিক মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনামূলক দ্বৈত সত্তার মধ্যেকার নীরব যুদ্ধের সংকেত বহন করে। ফেলে আসা অতীত সম্পর্কের ভিন্ন সমীকরণ থেকে তিনি লেখেন, 
‘ভালোবাসা সহজ ছিল 
ভার ছিল তার বেশ’
উজ্জ্বলের কবিতায় এই আপাত-স্ববিরোধী বাক্যাংশের মধ্য দিয়ে ভালোবাসার চিরায়ত সত্য উন্মোচিত হয়। অতীতে ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা হয়তো জটিল ছিল না, তা ছিল ‘সহজ’ বা কৃত্রিমতাহীন; কিন্তু সেই সম্পর্কের দায়, বিশ্বস্ততা ও আত্মিক অঙ্গীকারের ‘ভার’ ছিল অপরিসীম। ভালোবাসাকে ধারণ করার জন্য যে আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের প্রয়োজন পড়ত, মানুষ তা অনায়াসে বহন করত বলেই সম্পর্কগুলো ছিল দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর। সেখানে সহজতার অর্থ অগভীরতা ছিল না, বরং তা ছিল দায়িত্বের ভারে পূর্ণ নিটোল সমর্পণ। কিন্তু সমকালীন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁকে উচ্চারণ করতে হয়, 
‘এই সময়ের সহজপাঠে 
প্রকাশ্যে প্রেম, গোপনে বিদ্বেষ।’ 
বর্তমান সময়ে জীবন ও অনুভূতি উভয়ই অত্যন্ত লঘু ও অগভীর হয়ে উঠেছে। মানুষ এখন ভালোবাসার গভীর ‘ভার’ বা দায় নিতে চায় না, বরং তার বাহ্যিক অবয়বটিকে সামাজিক প্রদর্শনের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলে। ফলে সম্পর্কের চালচিত্র দাঁড়িয়ে থাকে মারাত্মক দ্বিচারিতার ওপর— বাইরে যখন দেখনদারি আবেগের প্রাচুর্য, ভেতরে তখন পুঞ্জীভূত হয়ে থাকে স্বার্থপরতা ও ঈর্ষার অন্ধকার। ‘প্রকাশ্যে প্রেম’ কেবল আত্মবিজ্ঞাপন ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মুখোশ, যার নিচে গোপনে লালিত হয় মারাত্মক ‘বিদ্বেষ’। অনুভূতি যেখানে পণ্যে রূপান্তরিত হয় এবং সম্পর্ক পরিণত হয় অভিনয়ের মঞ্চে, সেখানে মানুষের ভেতরের এই দ্বৈততাই আধুনিক অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়ায়। কবিতার নিরেট বয়ানে কবি বর্তমানের আলোঝলমলে শূন্যতার দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তোলেন। কাজেই তাঁর কবিতার অবয়ব বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাঁর কাব্যভাষা মানুষের অন্তর্জগতের নিভৃত ক্ষতগুলোকে অনাবৃত করে। টিকে থাকার নিরবচ্ছিন্ন সাধনা থেকে শুরু করে মরীচিকাময় আশ্রয়, শেকড়হীন ভারসাম্যহীনতা, সামাজিক সংবেদন, কিংবা সমকালীন ভণ্ডামির রূপ আসলে আধুনিক অস্তিত্বেরই এক একটি স্বতন্ত্র কিন্তু পরস্পরযুক্ত সংকটকে চিহ্নিত করে যায়। তিনি পাঠককে কোনো কৃত্রিম স্বান্ত্বনা বা অলীক মুক্তির পথ দেখানোর বদলে, চরম নির্মোহ ভঙ্গিতে মানুষের নিঃসঙ্গতা, আত্মপ্রবঞ্চনা ও সম্পর্কের ভঙ্গুরতাকে মেনে নেওয়ার ছবি আঁকেন। তাই সংহত গঠনের ভেতরে গভীর মেটাফিজিক্যাল দ্যোতনা এবং সমাজবাস্তবতার সংবেদনশীল মেলবন্ধনই তাঁর কবিতাকে গতানুগতিক আবেগপ্রবণতা থেকে মুক্ত করে চিরন্তন দার্শনিক অভিঘাতে উন্নীত করে। ফলে তাঁর কবিতার পংক্তি সমাপ্তির পরেও পাঠকের চেতনায় রেখে যায় দীর্ঘ অস্বস্তিকর ভাবনার রেশ।