সন্ধিপূজায় দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতে হয় প্রতিমাকে
নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: এক সময় জমিদারি ছিল। দুর্গাপুজোও হত খুবই ধুমধাম করে। ঝাড়বাতির আলোর রোশনাইয়ে মন্দির প্রাঙ্গন ঝলমল করত। অতীতের সেই জৌলুস কমলেও পুজোর আকর্ষণ কমেনি আউশগ্রামের জঙ্গলঘেরা গোস্বামীখণ্ড গ্রামের বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজোর। এই পুজোর বয়স ৩০০ পেরিয়েছে।
বংশের আদি পুরুষ গোপীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় পুজোর সূচনা করেন। তবে তিনি যে মন্দির নির্মাণ করেছিলেন সেটি ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পুরনো মন্দিরটির পাশে ১২৭১ বঙ্গাব্দে একটি নতুন দুর্গা মন্দির নির্মাণ করেন গোপীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রপৌত্র সারদাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় ও গোপালপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, পুরনো মন্দিরে যে বেদীটি ছিল সেটি নতুন মন্দিরের মাথায় স্থাপন করা আছে। রীতি মেনে মায়ের ঘট ও নবপত্রিকা এনে প্রথমে পশ্চিম প্রান্তে পুরনো মন্দিরের জায়গায় আগে পুজো করা হয় তারপর তা নতুন মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয় ও সেখানে পুজো হয়।
পরিবারের সদস্য অমর বন্দোপাধ্যায় জানান, রথ যাত্রার পুণ্য তিথিতে সাধারণত কাঠামো পূজার মধ্য দিয়েই অনেক জায়গায় শারদীয় দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। কিন্তু আমাদের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের প্রাচীন প্রথা মেনে রথ যাত্রার দিন কাঠামো পুজোর পাশাপাশি কুলপুরোহিত প্রথমে মায়ের গায়ে গঙ্গামাটি দেন। তারপর মৃৎশিল্পী প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু করেন। একই বংশের মানুষ প্রতিমা তৈরী করে আসছিলেন। তবে বংশপরম্পরায় পারিবারিক এই শিল্প নিয়ে কেউ না এগিয়ে আসার ফলে নতুন মৃৎশিল্পী দিয়ে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়েছে। মৃৎশিল্পীরাও গ্রামেরই বাসিন্দা। এখানে তিন চালার সোলার সাজের মূর্তি। আগে একচালার প্রতিমা হলেও বর্তমানে বিসর্জনের সুবিধের জন্য সামান্য পরিবর্তন করা হয়েছে। মায়ের শোলার সাজও বংশপরম্পরায় আগে তৈরি করতেন স্থানীয় মালাকার পরিবারের সদস্যরা। তবে এখন রেডিমেড সাজ কিনে আনা হয়। পরিবারের সদস্য প্রদীপ বন্দোপাধ্যায় বলেন, ষষ্ঠীতে মায়ের মন্দির পুজো শুরু হলেও সপ্তমী থেকে মায়ের অন্নভোগ হয়। সেখানে প্রধান পদটি হল কচুর শাক। যেটি ছাড়া ভোগ নিবেদন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পরম্পরা মেনে মায়ের ভোগ বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটি বাড়ির ছেলেরা করে আসছে। তাছাড়া দশমীতে কুমারী পুজো দেখতে বহু মানুষ ভিড় করেন।
শোনা যায় আগে বলিদান প্রথা ছিল। অষ্টমীতে সাদা পাঁঠা বলি ও নবমীতে দুটি বলি হত। পরবর্তীকালে স্বপ্নাদেশ পেয়েই বলিদান প্রথা উঠে যায়। বর্তমানে মাসকলাই বলি হয় ও নবমীতে হোম হয়। রীতি মেনে মায়ের গর্ভগৃহের পাশের ঘর থেকে কুলো দেবতা শ্রীধর জিউকে এনে রাখা হয় দুর্গা প্রতিমার পাশে। বাড়ি থেকে মহালক্ষ্মীকে আনা হয় দুর্গা মন্ডপে। পরিবারের সদস্য সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ষষ্ঠীর দিন সকালে দেবী প্রতিমাকে বেদীর উপরে স্থাপন করা হয়। এরপর পেছনের দেওয়ালে লেগে থাকা তিনটি কড়ার সঙ্গে প্রতিমাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। কথিত আছে সন্ধি পুজোর সময় প্রতিমা দুলে ওঠে। আগে মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোয় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো প্রতিমা। এখন দড়ি দিয়ে প্রতিমা বাঁধা থাকে। পুজোয় একটি ঘি ও একটি তেলের প্রদীপ দশমী পর্যন্ত জ্বালিয়ে রাখার রীতি আছে। একে মহাপ্রদীপ বলা হয়। কোনভাবেই যাতে প্রদীপ না নেভে সেজন্য বিশেষ সতর্ক থাকেন পরিবারের সদস্যরা। প্রদীপ নিভলে তাতে বিপদের আভাস থাকে বলে বিশ্বাস করা হয়।
পরিবারের মেয়ে পৌলমী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দশমীতে কুমারী পুজোর পর পুষ্পাঞ্জলি হয়। এদিন সিঁদুর খেলা হয়। তাতে ছোট-বড়, বিবাহিত-অবিবাহিত, মহিলা-পুরুষ কোন বিভেদ থাকে না। সিন্দুর খেলতে খেলতেই ঘট বিসর্জনের জন্য এগিয়ে যাওয়া হয়। ঘট বিসর্জনের সময় আকাশে প্রত্যেকবার শঙ্খচিল দেখা যায়।

