ঝাড়ুদার হতে চাওয়া রিঙ্কু সিং যেভাবে আজ বিশ্বজয়ী তারকা
নিজস্ব প্রতিনিধি: জীবন যখন সব দিক থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখনও যারা ভাগ্যের চোখে চোখ রেখে লড়াই চালিয়ে যায়, শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই জয়গান গায়। ক্রিকেটের বাইশ গজে এমনই এক রূপকথার নাম রিঙ্কু সিং। একসময় অভাবের তাড়নায় যাঁর হাতে ক্রিকেট ব্যাটের বদলে ঝাড়ু তুলে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, নিজের জেদ আর ‘হাল না ছাড়া’ মানসিকতার জোরে তিনি আজ কোটি কোটি তরুণের অনুপ্রেরণা।
উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ের এক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম রিঙ্কুর। পাঁচ ভাইয়ের বিশাল পরিবারে বাবা বাড়ি বাড়ি এলপিজি সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার কাজ করতেন। অভাব এতটাই নিত্যসঙ্গী ছিল যে, পরিবারের ঋণের বোঝা কমাতে পড়াশোনা না জানা রিঙ্কু বড় ভাইয়ের কাছে একটি কাজের খোঁজ চান। ভাই তাঁকে যেখানে নিয়ে যান, সেখানে রিঙ্কুকে ঘর ও কোচিং সেন্টারের মেঝে ঝাড়ু দেওয়ার কাজ দেওয়া হয়। কিন্তু রিঙ্কুর মন পড়েছিল ক্রিকেট মাঠে। তিনি সেদিনই কাজ ছেড়ে বাড়ি ফিরে মাকে বলেছিলেন, “আমি ঝাড়ু দেব না, আমি ক্রিকেট খেলেই ভাগ্য বদলাব”।
ধুলোবালি মাখা পিচে দিন-রাত এক করে অনুশীলন শুরু করেন রিঙ্কু। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফর্ম করার পর ২০১৮ সালে কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) তাঁকে আইপিএলে দলে নেয়। কিন্তু প্রথম কয়েক বছর তাঁকে বেশিরভাগ সময় বেঞ্চেই বসে কাটাতে হয়েছিল। চোট-আঘাত এবং খারাপ ফর্মের কারণে দল থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু রিঙ্কু দমে যাননি। সুযোগের অপেক্ষা করেছেন এবং নিজেকে নীরবে তৈরি করেছেন।
অবশেষে ২০২৩ সালের আইপিএলে গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে সেই ম্যাজিক মুহূর্ত আসে। শেষ ওভারে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ২৮ রান। ক্রিকেটের ব্যাকরণে যা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু রিঙ্কু সিং পরপর ৫টি বলে ৫টি ছক্কা মেরে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখান। রাতারাতি তিনি ক্রিকেট বিশ্বের ‘আলটিমেট ফিনিশার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই অদম্য পারফরম্যান্সেরই পুরস্কার হিসেবে ভারতীয় দলে তাঁর অভিষেক ঘটে এবং ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলেও তিনি ভারতের অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করেছেন।
রিঙ্কু সিংয়ের এই জীবনযুদ্ধ প্রমাণ করে যে, প্রতিভা বা সুযোগের চেয়েও মানুষের ‘হাল না ছাড়ার’ জেদ অনেক বেশি শক্তিশালী। চারপাশের পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, নিজের স্বপ্নের প্রতি অবিচল বিশ্বাস থাকলে একদিন সাফল্য ধরা দিতে বাধ্য। আজ যিনি বিশ্বমঞ্চে ছক্কা হাঁকাচ্ছেন, তিনি আসলে জীবনের সমস্ত কঠিন পরিস্থিতিকে মাঠের বাইরে পাঠিয়েছেন।

