হট টপিক
ইতিহাসের আলোকে তারাপীঠ
প্রকাশিত: ৪ জুন, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদনঃ পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার রামপুরহাটের কাছে অবস্থিত তারাপীঠ মন্দির সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি মহাশক্তিপীঠ ও তান্ত্রিক সাধনার ঐতিহাসিক কেন্দ্র। দ্বারকা নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দিরটি দেবী কালীর অন্যতমা মহাবিদ্যা 'মা তারা'-র উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। হাজার বছরের প্রাচীন লোকগাথা, পৌরাণিক অলৌকিক কাহিনি এবং আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র হলো এই তারাপীঠ।
পৌরাণিক প্রেক্ষাপট ও নামকরণ
তারাপীঠের উৎপত্তি নিয়ে প্রধানত দুটি পৌরাণিক মত প্রচলিত আছে:
• সতীর অক্ষিতারকা: একটি বিশ্বাস অনুযায়ী, বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে দেবী সতীর দেহ খণ্ডিত হওয়ার সময় তাঁর চোখের মণি বা ‘তারা’ এই স্থানে পতিত হয়েছিল। চক্ষুর মণি পতনের কারণে এই পুণ্যভূমির নাম হয় 'তারাপীঠ'।
• মহর্ষি বশিষ্ঠের তপস্যা: অন্য একটি কাহিনি অনুসারে, ব্রহ্মার মানসপুত্র বশিষ্ঠদেব এই মহাশ্মশানে দীর্ঘকাল দেবী তারার কঠোর সাধনা করেছিলেন। তাঁর সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা ‘তারা’ রূপে দেখা দেন এবং মহাদেবকে স্তন্যপান করানোর মাতৃরূপে তাঁকে দর্শন দেন।
মন্দিরের ঐতিহাসিক বিবর্তন
বর্তমান তারাপীঠ মন্দিরের কাঠামোটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো হলেও এর আধ্যাত্মিক ইতিহাস বহু প্রাচীন। কথিত আছে, মধ্যযুগে বণিক জয়দত্ত সওদাগর বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় তাঁর মৃত পুত্রকে মহাশ্মশানের সঞ্জীবনী কুণ্ডের জলে স্পর্শ করিয়ে পুনর্জীবিত করেন। এরপর তিনি স্বপ্নদেশ পেয়ে শ্মশান থেকে মায়ের মূল শিলামূর্তিটি উদ্ধার করে প্রথম মন্দিরটি নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজা ও ভক্তদের দ্বারা এই মন্দিরের সংস্কার সম্পন্ন হয়। বর্তমান লাল ইটের চারচালা শৈলীর মন্দিরটি প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন।
তান্ত্রিক সাধনা ও সাধক বামাক্ষ্যাপা
তারাপীঠকে একটি জাগ্রত 'সিদ্ধপীঠ' বলা হয়। এখানকার মন্দির সংলগ্ন মহাশ্মশানটি তন্ত্র সাধনার জন্য বিশ্ববিখ্যাত। ঊনবিংশ শতকের মহান তান্ত্রিক সাধক বামাক্ষ্যাপা (যাঁকে তারাপীঠের ক্ষ্যাপা বাবা বলা হয়) এই শ্মশানেই কঠোর সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক অলৌকিকতা এই স্থানটিকে ভারতবর্ষের অন্যতম প্রধান তীর্থক্ষেত্রে পরিণত করে।
বর্তমান গুরুত্ব
মন্দিরের গর্ভগৃহে মা তারার মূল শিলামূর্তিটি রয়েছে, যেখানে দেবী শিবকে কোলে নিয়ে স্তন্যপান করাচ্ছেন। দিনের বেলা এই মূর্তিটি একটি রূপো ও সোনার মুখোশ এবং শাড়িতে আবৃত থাকে। প্রতি বছর কৌশিকী অমাবস্যা সহ বিভিন্ন উৎসবের সময় দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও সাধক এখানে আসেন। সব মিলিয়ে, তারাপীঠ মন্দির আজও ভক্তি, তন্ত্র ও বাংলার গৌরবময় ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক।
তারাপীঠ যাওয়ার জন্য বাস, ট্রেন এবং গাড়ি—সব রকমের ব্যবস্থাই রয়েছে।
. ট্রেনে কীভাবে যাবেন? এখানে আসার সবচেয়ে সহজ এবং জনপ্রিয় মাধ্যম হলো ট্রেন।
• নিকটবর্তী রেল স্টেশন: তারাপীঠের সবচেয়ে কাছের স্টেশন হলো রামপুরহাট জংশন (RPH)। এটি মন্দির থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে।
• কলকাতা থেকে ট্রেন: হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে রামপুরহাটের জন্য সারাদিন প্রচুর ট্রেন আছে। যেমন—মা তারা এক্সপ্রেস, গণদেবতা এক্সপ্রেস, শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস ইত্যাদি।
• স্টেশন থেকে মন্দির: রামপুরহাট স্টেশনে নেমে আপনি সহজেই অটো, টোটো বা ক্যাব পেয়ে যাবেন। সেখান থেকে মন্দিরে পৌঁছাতে মাত্র ২০ থেকে ২৫ মিনিট সময় লাগে।
২. সড়কপথে বা গাড়িতে কীভাবে যাবেন
আপনি যদি কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোনো জেলা থেকে নিজস্ব গাড়ি বা বাসে যেতে চান:
• কলকাতা থেকে দূরত্ব: কলকাতা থেকে তারাপীঠের দূরত্ব প্রায় ২২০ কিলোমিটার।
• রুট: কলকাতা থেকে ডানকুনি হয়ে জাতীয় সড়ক ১৯ (NH-19) ধরে বর্ধমান যান। এরপর গুসকরা ও বোলপুর (শান্তিনিকেতন) হয়ে সরাসরি তারাপীঠ রোড ধরে পৌঁছে যান। গাড়ি বা ক্যাবে সময় লাগবে আনুমানিক ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা।
• বাস পরিষেবা: ধর্মতলা (কলকাতা), আসানসোল, দুর্গাপুর বা বর্ধমান থেকে সরাসরি তারাপীঠ বা রামপুরহাটের সরকারি ও বেসরকারি বাস পাওয়া যায়।

