বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
অবকাশ

স্মৃতির সরণিতে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়: সুরের আকাশের উজ্জ্বল ধ্রুবতারা

প্রকাশিত: ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
স্মৃতির সরণিতে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়: সুরের আকাশের উজ্জ্বল ধ্রুবতারা
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

বিশেষ প্রতিবেদন: ৭ সেপ্টেম্বর এলেই বাঙালির মন খারাপ হয়ে যায়। কারন বাংলা সঙ্গীত জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্বর্ণযুগের জাদুকর, কালজয়ী গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আজ প্রয়াণ দিবস। ১৯৯৯ সালের আজকের দিনেই হুগলি নদীর বুকে এক জলযান থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবনের যবনিকা টেনেছিলেন তিনি। তাঁর সেই আকস্মিক ও মর্মান্তিক বিদায় স্তব্ধ করে দিয়েছিল আপামর সঙ্গীতপ্রেমী বাঙালিকে। কিন্তু দেহাবসান ঘটলেও, বাঙালির মননে, সুখে-দুঃখে, প্রেমে ও বিরহে তিনি আজও সমানভাবে জীবন্ত। তাঁর লেখনী থেকে নিঃসৃত হাজার হাজার গান আজও বাঙালির প্রতিদিনের সঙ্গী। স্বতন্ত্র খবর তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। 
১৯৩১ সালের ২ মে হাওড়ার সালকিয়ায় এক সম্ভ্রান্ত ও শিল্পমনস্ক পরিবারে জন্ম হয় পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তাঁর পিতা কান্তিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন নির্বাক যুগের এক বিশিষ্ট অভিনেতা এবং শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী। পিতার সূত্রে তাঁদের হাওড়ার বাড়িতে নিয়মিত বসত সঙ্গীত, সাহিত্য ও নাটকের জমজমাট আড্ডা। শৈশবের এই সাংস্কৃতিক পরিবেশই খুব ছোটবেলা থেকে পুলকবাবুর মনে সাহিত্য ও কাব্যের বীজ বুনে দিয়েছিল। কলকাতার বিখ্যাত স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক হওয়ার পর তিনি পুরোপুরি নিজেকে সঁপে দেন সুর ও শব্দের খেলায়। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ‘অভিমান’ নামক চলচ্চিত্রে প্রথম গান লিখে পেশাদার গীতিকার হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে।
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল তাঁর সহজ, সরল অথচ গভীর জীবনমুখী শব্দচয়ন। জটিল তাত্ত্বিক কথার বেড়াজালে না গিয়ে, সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে তিনি অনায়াসে গানের পঙক্তিতে রূপ দিতে পারতেন। সুরের ওপর মুহূর্তের মধ্যে গান লিখে ফেলার এক আশ্চর্য এবং ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা ছিল তাঁর। একবার পুজোর গানের পরিকল্পনা করতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়েছেন পুলকবাবু। তাঁকে দেখেই হেমন্তবাবু বলে উঠলেন, “পুলক, কতদিন পরে এলে; একটু বসো”। আর এই সাধারণ কথাটিই মুহূর্তের মধ্যে জাদুমন্ত্রের মতো কাজ করল গীতিকারের মাথায়। তিনি সেখান থেকেই বুনে ফেললেন অমর এক গানের লাইন। সঙ্গীত জগতের এই সহজ রসায়নই তাঁকে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং ব্যস্ত গীতিকার করে তুলেছিল। 
বাংলা গানের স্বর্ণযুগে এমন কোনও প্রথম সারির শিল্পী বা সুরকার ছিলেন না, যিনি পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় কণ্ঠ মেলাননি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, গীতা দত্ত, শ্যামল মিত্র এবং ভূপেন হাজারিকার মতো কিংবদন্তিরা তাঁর লেখা গান গেয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। বিশেষ করে মান্না দে-র সঙ্গে তাঁর জুটির প্রতিটি গানই কালজয়ী। ‘প্রথম কদম ফুল’ সিনেমার জন্য তাঁর লেখা বিখ্যাত মজাদার গান “আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না” আজও বাঙালির রসনা তৃপ্তির সমার্থক। আবার ‘শঙ্খবেলা’ চলচ্চিত্রে লতা মঙ্গেশকর ও মান্না দে-র কণ্ঠে “কে প্রথম কাছে এসেছি” কিংবা লতাজির একক কণ্ঠে “আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব” গানগুলি বাঙালির চিরন্তন প্রেমের দলিল হয়ে রয়েছে। মান্না দে-র ধ্রুপদী ঘরানার গায়কির সঙ্গে পুলকবাবুর আটপৌরে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার মেলবন্ধন এক জাদুর সৃষ্টি করত। মান্না দে যখনই নতুন কোনও সুর বাঁধতেন বা কোনও বিশেষ গান গাওয়ার কথা ভাবতেন, তাঁর প্রথম পছন্দই হতেন ‘পুলকদা’। স্টুডিওতে আড্ডার ছলে, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই এই দুজনে মিলে তৈরি করে ফেলতেন একের পর এক ইতিহাস। পুলকবাবুর লেখার গতি এবং মান্না দে-র সুরের সূক্ষ্মতা— দুইয়ে মিলে বাংলা আধুনিক গানের ধারাকে সমৃদ্ধ করে গিয়েছে দশকের পর দশক।

পুলকবাবুর ব্যক্তিগত ও সৃষ্টিশীল জীবনের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গল্প জড়িয়ে রয়েছে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া “বড় সাধ জাগে, একবার তোমায় দেখি” গানটির পেছনে। শোনা যায়, এক অজ্ঞাতপরিচয় মহিলা অনুরাগী প্রায়শই পুলকবাবুকে ফোন করতেন, কিন্তু নিজের পরিচয় বা নাম-ঠিকানা কখনও জানাতেন না। বহু অনুরোধের পর একদিন সেই নারী দেখা করতে রাজি হন। নির্দিষ্ট দিনে বিকেলে পুলকবাবু যখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বেরোবেন, ঠিক তখনই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জরুরি ফোন আসে পুজোয় প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গানের রেকর্ডিংয়ের জন্য। পেশাদারিত্বের খাতিরে সেই অনুরাগী মহিলার সঙ্গে দেখা না করে হেমন্তবাবুর বাড়ি চলে যান তিনি। এর পর সেই রহস্যময়ী নারী আর কোনওদিন ফোন করেননি। এই না-পাওয়ার আকুলতা ও আফসোস থেকেই জন্ম নেয় সেই চিরসবুজ গান— “বড় সাধ জাগে...”।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাংলা আধুনিক গান ও চলচ্চিত্রের সুরের দুনিয়া অনেকটাই বদলে গিয়েছে। কিন্তু পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গানের আবেদন আজও অমলিন। তিনি শুধু গান লেখেননি, তিনি আসলে বাঙালির জীবনের প্রতি মুহূর্তের অনুভূতিগুলিকে শব্দের ফ্রেমে বন্দি করে গিয়েছেন। গঙ্গাবক্ষে তাঁর জীবনের আকস্মিক সমাপ্তি ঘটলেও, বাঙালির হৃদয়ের মণিকোঠায় তিনি তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।

আরও অবকাশ খবর