বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
সাহিত্য সংস্কৃতি

দীপ্র ভট্টাচার্যের প্রবন্ধ "এক টুকরো মিষ্টি সুখের স্বাদ"

প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
দীপ্র ভট্টাচার্যের প্রবন্ধ "এক টুকরো মিষ্টি সুখের স্বাদ"
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

১৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক চকোলেট দিবস - মিষ্টি স্বাদের উদযাপনের দিন

রাতের শহর তখন একটু একটু করে চুপ করে আসছে। জানলার বাইরে বৃষ্টি হলে কথাই নেই—আলো-আঁধারির ঘরে টেবিলের উপর রাখা চকোলেটের মোড়কটা হঠাৎ যেন খুব আপন হয়ে ওঠে। আঙুলে কাগজের মৃদু শব্দ, মোড়ক খুলতেই কোকোর গন্ধ। তারপর ছোট্ট এক টুকরো জিভে রাখা। প্রথমে সামান্য তেতো, তারপর মিষ্টি । অদ্ভুত এক স্বাদ—যেন সুখেরও একটু অন্ধকার থাকে। 

১৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক চকোলেট দিবস। পৃথিবীর নানা প্রান্তে এই দিনটি চকোলেটের উৎসব হিসেবেই চিহ্নিত। দিনটির সঙ্গে মিল্টন এস. হার্শের জন্মদিনের সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে চকোলেটের ইতিহাস হার্শের বহু আগে, ইউরোপীয় সভ্যতারও বহু আগে শুরু। আর সেই ইতিহাসের শুরু মিষ্টি দিয়ে নয়—তেতো এক পানীয় দিয়ে। 

কোকো গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ‘থিওব্রোমা কাকাও’। গ্রিক শব্দ থেকে যার অর্থ দাঁড়ায়—‘দেবতাদের খাদ্য’। গাছটির ফল দেখতে বেশ অদ্ভুত, মোটা ডিম্বাকার শুঁটির মতো। তার ভিতরে সাদা শাঁসে মোড়া কোকোর বীজ। কিন্তু গাছ থেকে ফল পেড়ে বীজ মুখে দিলেই চকোলেট হয় না। বীজকে ফারমেন্ট করতে হয়, শুকোতে হয়, ভাজতে হয়, খোসা ছাড়াতে হয়, পিষতে হয়। তারপর তার মধ্যে থেকে তৈরি হয় কোকো মাস, কোকো বাটার, কোকো পাউডার। সেই দীর্ঘ রসায়ন ও কারিগরির শেষে জন্ম নেয় আমাদের চকোলেট। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বলছে, প্রায় পাঁচ হাজার তিনশো বছর আগেও দক্ষিণ আমেরিকার মানুষ কোকো ব্যবহার করত। অর্থাৎ চকোলেট কোনও আধুনিক আবিষ্কার নয়; মানুষের খাদ্য-স্মৃতিতে তার বয়স সভ্যতার বহু পুরোনো স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মায়া ও অ্যাজটেক সমাজে কোকো ছিল মর্যাদার বস্তু, ধর্মীয় আচার ও সামাজিক জীবনের অংশ। তখন অবশ্য চকোলেট মানে আজকের মিষ্টি বার নয়। ছিল তেতো পানীয়—কখনও লঙ্কা, কখনও ভ্যানিলা, কখনও নানা মশলার সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া হত। তারপর ইউরোপে এল চিনি। আর কোকোর ভাগ্য গেল বদলে।

পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি শিল্পের তেতো অঙ্ক টা কিন্তু জানার মতো। আজ পৃথিবীতে যে বিপুল পরিমাণ চকোলেট খাওয়া হয়, তার পিছনে রয়েছে কয়েক মিলিয়ন টনের এক বিশাল কৃষি-অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক কোকো অর্গানাইজেশনের ২০২৪-২৫ মরশুমের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে কোকো উৎপাদন প্রায় ৪৭.২৩ লক্ষ টন। আজ যে চকোলেটের দাম দোকানে হঠাৎ বাড়ে বা কমে, তার পিছনে শুধু বাজারের খেলা নয়; বৃষ্টি, রোগ, গাছের ফলন, কৃষকের বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মজুত—সবকিছু কাজ করে। আর কোকোর পৃথিবীটি আশ্চর্যরকমভাবে আফ্রিকান। কোকোর উৎপাদনে কয়েকটি দেশই বিশ্ববাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। আন্তর্জাতিক কোকো অর্গানাইজেশনের হিসাবে, আইভরি কোস্ট, ঘানা ও ইকুয়েডর—এই তিন দেশ মিলিয়েই বিশ্বের কোকো উৎপাদনের বিরাট অংশ জোগায়। পুরনো পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, বিশ্বের মাত্র নয়টি প্রধান উৎপাদক দেশ মিলে মোট উৎপাদনের ৯৩ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করত। 

কিন্তু চকোলেটের দোকানের ঝকঝকে কাচের ওপারে যে বিলাসিতা, তার শুরুটা অনেক সময় দারিদ্র্যের মধ্যে। ঘানা ও আইভরি কোস্টে কোকো একটি পরিবারের মোট আয়ের প্রধান উৎসগুলির অন্যতম—একটি আন্তর্জাতিক কোকো অর্গানাইজেশন-সমর্থিত গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কোকো থেকে ঘানার পরিবারগুলির প্রায় ৬১ শতাংশ এবং আইভরি কোস্টের পরিবারগুলির প্রায় ৬৬ শতাংশ আয় আসে। অথচ কোকো চাষিদের বড় অংশ এখনও দারিদ্র্যসীমার নীচে জীবনযাপন করেন। এই বৈপরীত্যটাই হয়তো চকোলেটের সবচেয়ে অচেনা স্বাদ—যে ফসল থেকে বিলাসিতা তৈরি হয়, তার চাষি নিজে সবসময় সেই বিলাসিতার নাগাল পান না।

কেন মন খারাপ হলে চকোলেট চাই? এবার আসা যাক মানুষের মাথার ভিতরের সেই রহস্যে। মন খারাপের দিনে চকোলেট কেন এত প্রিয়? পরীক্ষা খারাপ হলে, প্রেম ভেঙে গেলে, দীর্ঘ কর্মদিবসের শেষে, কিংবা নিছক বৃষ্টিভেজা বিকেলে—কেন মনে হয়, এক টুকরো চকোলেট যেন পরিস্থিতিটাকে খানিকটা সহনীয় করে দিতে পারে? এর একটা অংশ মনস্তাত্ত্বিক। খাবার শুধু পেট ভরায় না; স্মৃতি, পুরস্কার, আরাম এবং আবেগের সঙ্গেও তার সম্পর্ক তৈরি হয়। ছোটবেলায় পাওয়া চকোলেট যদি আনন্দের কোনও মুহূর্তের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে, বড় হয়েও সেই স্বাদ মস্তিষ্কে সেই স্মৃতির দরজা খুলে দিতে পারে। ফলে চকোলেট তখন খাদ্য নয়—একটি ‘আবেগের সংকেত’। তার সঙ্গে আছে মস্তিষ্কের পুরস্কার-ব্যবস্থা। চকোলেটের চিনি, চর্বি, গন্ধ, মুখে গলে যাওয়ার অনুভূতি—সব মিলিয়ে তা অত্যন্ত আকর্ষণীয় খাদ্য হয়ে ওঠে। তাই চকোলেটের প্রতি আকাঙ্ক্ষা নিছক ‘লোভ’ নয়; তার মধ্যে অভ্যাস, স্মৃতি, পরিবেশ এবং মস্তিষ্কের পুরস্কার-প্রক্রিয়া—সবই জড়িত।

আর কোকোর নিজস্ব কিছু রাসায়নিক উপাদানও আছে। কোকোতে থাকা ফ্ল্যাভানল নিয়ে গবেষণায় মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ, জ্ঞানীয় কর্মক্ষমতা এবং মেজাজের উপর সম্ভাব্য প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একটি মেটা-বিশ্লেষণে কোকো-সমৃদ্ধ খাদ্য স্বল্পমেয়াদে ইতিবাচক ও নেতিবাচক মেজাজ—দুই ক্ষেত্রেই কিছু উন্নতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে গবেষকেরা সতর্কও করেছেন—এই ফলকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা বা ‘চকোলেট খেলেই মন ভালো’ ধরনের সরল সিদ্ধান্তে নামিয়ে আনা যায় না। অর্থাৎ চকোলেট সুখের ওষুধ নয়। কিন্তু সুখের সঙ্গে তার সম্পর্ক বাস্তব—শরীরের রসায়ন, মস্তিষ্কের পুরস্কার-ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিগত স্মৃতি—তিনটিই সেখানে কাজ করতে পারে। তবে আর একটি কথা মনে রাখা দরকার। ‘ডার্ক চকোলেট’ মানেই স্বাস্থ্যকর খাবার—এমন সরল সমীকরণও ঠিক নয়। কোকোর ফ্ল্যাভানলের সম্ভাব্য উপকার নিয়ে গবেষণা আছে, কিন্তু বাজারের চকোলেটে চিনি ও ক্যালরির পরিমাণও যথেষ্ট হতে পারে। ফলে চকোলেটকে ওষুধ বানানোর প্রয়োজন নেই; তাকে চকোলেট হিসেবেই ভালোবাসা যায়।  

কোকোর বীজের গল্প এখানেই শেষ নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, গাছের রোগ এবং কৃষকের আয়—সব মিলিয়ে কোকো শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তাই ১৩ সেপ্টেম্বর চকোলেটের মোড়ক খুললে শুধু মিষ্টিটুকু মনে রাখলে গল্পের অর্ধেকই জানা হয়। মনে রাখা যায় একটি কোকো গাছকে। তার ভেজা মাটি। ফলের ভিতর সাদা শাঁসে ঢাকা বীজ। কোনও এক আফ্রিকান কৃষকের হাত। ফারমেন্টেশানের অদৃশ্য জীবাণু। আগুনে ভাজার গন্ধ। কারখানার উষ্ণতা। হাজার মাইল পেরিয়ে আসা পণ্যবাহী জাহাজ। শহরের দোকানের আলো। আর শেষে আমাদের আঙুলে ধরা সেই ছোট্ট বাদামি টুকরো। চকোলেট আসলে অদ্ভুত এক বস্তু। তার মধ্যে ইতিহাস আছে, অর্থনীতি আছে, বিজ্ঞান আছে, রাজনীতি আছে, শ্রম আছে। আর আছে মানুষের একেবারে ব্যক্তিগত দুর্বলতা—মন খারাপ হলে একটু সুখ চাওয়ার দুর্বলতা। তাই চকোলেটের শেষ কামড়টা দেওয়ার আগে একবার থামা যায়। চোখ বুজে গন্ধটা নেওয়া যায়। তারপর মনে হতে পারে—এই সামান্য মিষ্টির পিছনে পৃথিবীটা কতখানি তেতো, কতখানি জটিল, আর কতখানি সুন্দর। হয়তো সেই জন্যই চকোলেট এত প্রিয়। সে আমাদের জিভে মিষ্টি, অথচ তার গল্পে পৃথিবীর স্বাদ—মিষ্টি, তেতো, নোনতা, টক—সব এ

কসঙ্গে।

 

 

 

আরও সাহিত্য সংস্কৃতি