বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
সাহিত্য সংস্কৃতি

বিশ্ব গন্ডার দিবস - ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিশ্ব গন্ডার দিবস - ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

সকালবেলা, একটা মুচকি হাসি মুখে নিয়ে কাগজ খুলে চশমাটা নাকের ডগায় নামাতেই রান্নাঘর থেকে আওয়াজ এলো, "আজ নাকি বিশ্ব গন্ডার দিবস! তা তোমার কি কোনো বিশেষ কর্মসূচি আছে, নাকি আজকেও ওই ভাঙা ইজিচেয়ারটায় বসে গন্ডারের চামড়া নিয়ে গবেষণা করবে?"

আমি চশমাটা আর একটু নামিয়ে  চেঁচিয়ে বললুম, "দেখো হে, গন্ডার শব্দটাকে তোমরা যেভাবে যত্রতত্র ব্যবহার করো, সেটা কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ। প্রথমত, আমি গন্ডার নই, বড়জোর গন্ডার-অনুগামী বলতে পারো। দ্বিতীয়ত, আজ ২২শে সেপ্টেম্বর, বিশ্ব গন্ডার দিবস। আজ অন্তত তাদের প্রতি একটু সমবেদনা দেখানো উচিত।"

রান্নাঘরের দিক থেকে আওয়াজ এলো, "সমবেদনা পরে দেখাবে, আগে বাজারের থলেটা নিয়ে বেরোও। বাজারে গিয়ে যে চড়া দাম শুনবে, তাতে এমনিতেই তোমার চামড়া গন্ডারের চেয়েও মোটা হয়ে যাবে।"

আসলে, বাঙালির জীবনে গন্ডার কোনো বন্যপ্রাণী নয়, ওটা একটা চারিত্রিক গুণ। আর, মানুষের চামড়া যত পাতলা হচ্ছে, মনের চামড়া তত মোটা হচ্ছে। আর আসল গন্ডারগুলো বনের মধ্যে বসে ভাবছে—মানুষের এই উন্নতি দেখে আমরা কোন মুখে মুখ দেখাই!

বাজারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলুম, গন্ডারদের নিয়ে আমরা কতই না অবিচার করি। আচ্ছা, গন্ডারদের কি কোনো সংসার আছে? তাদের কি কোনো মেজাজি গিন্নি আছে যে সকালবেলা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলে—"হ্যাঁগো, পাশের ঝোপের সুমাত্রান গন্ডারবাবু তো নতুন একটা কাদার হ্রদ কিনেছেন, তুমি তো এক ফোঁটা কাদা জোগাড় করতে পারলে না সারা জীবনে!"

গন্ডাররা কিন্তু ভারী শান্ত শিষ্ট জীব। বনের মধ্যে নিজেদের মতো থাকে, লতাপাতা খায়, আর কাদা মাখে। তাদের কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। তারা কোনোদিন ব্যাঙ্কে লাইনে দাঁড়িয়ে লোন নেওয়ার জন্য ম্যানেজারকে তোষামোদ করে না। প্রমোশনের জন্য বসের পেছনে ঘোরে না। অথচ আমরা সারাক্ষণ বলে চলি—"কী গন্ডারের মতো চামড়া রে বাবা! কোনো কিছুতেই গায়ে লাগে না।"
আরে মশাই, গায়ে না লাগাটাই তো আজকের দিনে পরম সুখ!

আজকালকার বাজারে টিকে থাকতে গেলে মানুষের চামড়াটা যদি গন্ডারের মতো না হয়, তবে তো দুদিনেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। একে বলে গন্ডার-দর্শন! জীবনে এই স্থিরতা না থাকলে সংসার চালানো দায়।

কিন্তু আফসোস, আসল গন্ডারদের অবস্থা ভালো নয়। সারা পৃথিবীতে নাকি মোটে পাঁচটা প্রজাতি বেঁচে আছে। হোয়াইট রাইনো, ব্ল্যাক রাইনো, জাভান, সুমাত্রান আর আমাদের ওদিকের একশৃঙ্গ গন্ডার। বনের গন্ডারদের শিং নাকি আন্তর্জাতিক চোরাবাজারে কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হয়। মানুষ বিশ্বাস করে, ওই শিং গুঁড়ো করে খেলে নাকি যৌবন ফিরে আসে, রোগ সারে!

কী আশ্চর্য বৈপরীত্য দেখুন! মানুষ নিজের ভেতরের গন্ডারত্ব অর্থাৎ নির্লজ্জতা বজায় রাখার জন্য বনের নিরীহ গন্ডারগুলোকে মেরে ফেলছে। মানুষের নিজের মাথায় কোনো শিং নেই, কিন্তু অন্যের মাথায় শিং দেখলেই সেটা ভেঙে নিজের ড্রয়িংরুমে সাজিয়ে রাখার জন্য তার হাত নিশপিশ করে। এ এক অদ্ভুত ব্যাধি!

গন্ডারদের শিং কিন্তু আসলে কোনো হাড় নয়। ওটা হলো এক জট পাকানো চুল বা রোম, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে 'কেরাটিন'। আমাদের চুল আর নখ যে জিনিসে তৈরি, গন্ডারের শিং-ও তাই। অথচ মানুষ সেই চুলের তৈরি জিনিসটা কেনার জন্য কোটি কোটি টাকা ওড়াচ্ছে! ভাবুন একবার, যদি কোনোদিন গন্ডাররা জানতে পারে যে মানুষের মাথার চুলও একই উপাদানে তৈরি, তবে তারা হয়তো চোরা শিকারীদের ধরতে দল বেঁধে শহরের সেলুনগুলোতে হানা দেবে!

বাঙালি কথাবার্তায় গন্ডার বারবার ঢুকে পড়েছে আমাদের অজান্তেই। আসলে গন্ডারের ওই গম্ভীর, ভাবলেশহীন মুখাবয়ব আমাদের চেনা জগতের বহু চেনা মানুষের সঙ্গে মিলে যায়। অফিসে যান, দেখবেন বস ঠিক বড় একটা আফ্রিকান ব্ল্যাক রাইনোর মতো মুখ করে ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছেন। আপনি যতই ইনক্রিমেন্টের কথা বলুন, ওর কান নড়বে না, চোখও কাঁপবে না। উনি ওঁর নিজের কাদার পাঁকেই মগ্ন।

বিশ্ব গন্ডার দিবসের আসল তাৎপর্য কিন্তু এটাই—নিজের ভেতরের গন্ডারটাকে চেনা।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের সবার উচিত আয়নার সামনে দাঁড়ানো। তারপর ভালো করে নিজেদের গাল, কপাল আর পিঠের চামড়াটা পরীক্ষা করা। যদি দেখেন কোনো অপমান, কোনো মূল্যবৃদ্ধি, কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আপনার গায়ে ফোসকা ধরাতে পারছে না—তবে বুঝবেন, আপনি সফলভাবে গন্ডার দিবসের অংশ হয়ে উঠেছেন।

বাজার থেকে যখন ফিরলুম, থলেতে তখন আধ কেজি পটল, একটা ছোট ওল আর কয়েকটা কাঁচালঙ্কা। থলিটা উপুড় করে দেখে তিনি বললেন, "এই বাজারে এইটুকু আনাজ আনলে? রুই মাছ আনতে বললুম, আনলে না?"

আমি খুব শান্ত গলায়, গন্ডার-সুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে বললুম, "আজ গন্ডার দিবস তো, তাই অহিংসার খাতিরে মাছটা বাদ দিলুম। তাছাড়া পটল আর ওল—দুটোরই গায়ের চামড়া বেশ শক্ত। আজকের দিনে এদের চিবিয়ে খাওয়াটাই সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।" তিনি আর কিছু বললেন না। শুধু ওলটা হাতে নিয়ে এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেন ওটা ওল নয়, গন্ডারের শিং দিয়ে তৈরি কোনো মারাত্মক অস্ত্র। আমি আর দাঁড়ালুম না, ইজিচেয়ারটার দিকে পা বাড়ালুম।

আহা, বনের গন্ডাররা বনে সুন্দর, আর সংসারের গন্ডাররা ইজিচেয়ারে! পৃথিবী জুড়েই গন্ডারদের জয় হোক, তাদের চামড়া আরও মোটা হোক, আর মানুষের বুদ্ধিটা অন্তত একটু পাতলা হোক! এই আশায় বুক বেঁধে সবাই মিলে বলি, শুভ বিশ্ব গন্ডার দিবস।

আরও সাহিত্য সংস্কৃতি