আমরা দেহ নই দেহী
মনস্তত্ত্ব নিয়ে ভগবদ্ গীতায় গভীর অনুসন্ধান ও পথনির্দেশ করা হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, দেহধারী জীবের শ্রদ্ধা ত্রিবিধ যা তাদের সাত্ত্বিক, রাজসিক এবং তামসিক প্রকৃতি থেকে জাত। মনকে জানা খুবই প্রয়োজন। ভারতীয় ঋষিরা তাই প্রথম থেকেই মনস্তত্ত্ব চর্চায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং তার পিছনে বহু সময় ব্যয় করেন। সাংখ্য দর্শন সেই চর্চা শুরু করেছিল, পরে বেদান্ত দর্শন তা আরো এগিয়ে নিয়ে যায়। ভারতীয় দর্শন ইন্দ্রিয়গুলির কার্যকলাপ গভীরভাবে অনুসন্ধান করে এই সত্য উপলব্ধি করেছে যে, মনই ইন্দ্রিয়গুলিকে চালায়। সেই উপলব্ধি থেকেই উচ্চাঙ্গের চর্চা শুরু হয়। পাশ্চাত্যের মনোবিজ্ঞান ছিল বর্হিমুখী। ফ্রয়েড যদিও মনোবিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে গভীরতা উপলব্ধি করেন কিন্তু তিনি সেই মনের ভিতর দেখতে পেলেন কেবল জঞ্জাল, হিংসা ও যৌন ক্ষুধার ইচ্ছা। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা। মানুষের শ্রদ্ধা তিন রকমের। এখানে মানুষকে বোঝাতে গিয়ে একটি পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। শব্দটি দেহী অর্থাৎ যার দেহ আছে। যেমন, যিনি গৃহে বাস করেন তাকে আমরা বলি গৃহী, তেমনি যিনি দেহের ভেতর থাকেন দেহি বলতে এখানে তাঁকে বোঝানো হচ্ছে। অর্থাৎ আমরা দেহ নই, আমরা দেহের মধ্যে বাস করছি। হয় আমরা দেহটিকে চালাচ্ছি অথবা দেহ আমাকে চালাচ্ছে। এখানে আরেকটি পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, স্বভাবজা অর্থাৎ স্বভাবজাত। স্বভাব মানে সংস্কার যা প্রত্যেকেরই নিজস্ব। একটি মনের সঙ্গে আরেকটি মনের কতনা তফাৎ। কত রকমেরই না মন আছে। অতীত অভিজ্ঞতা, অতীত কর্ম, জগতের সঙ্গে বহু রকম ঘাত প্রতিঘাত এসব নিয়েই আমাদের মন গড়ে ওঠে। মনের এই অবস্থাকেই স্বভাব বা "নিজস্ব প্রকৃতি" বলে। ভবিষ্যতে এই প্রকৃতিকে ব্যক্তি পাল্টাতে পারেন, শোধরাতে পারেন আবার নীচেও নামাতে পারেন। কারো মনের সংস্কার যদি আর একজনের সংস্কার থেকে আলাদা হয়, তবে তার শ্রদ্ধাও অন্য ধরনের হতে বাধ্য। ব্যক্তির মানসিক প্রকৃতি অনুযায়ী শ্রদ্ধার প্রকৃতি তৈরি হয়। বাস্তব জীবনে যিনি যেমন, তাঁর শ্রদ্ধাও অনুরূপ। মানুষের মনের গঠন কি বিচিত্র! জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি কর্মেই ব্যক্তির সংস্কার এবং শ্রদ্ধা প্রতিফলিত হবে। তাই সাত্ত্বিকরা দেবগণের পূজা করেন, রাজসিকরা যক্ষ ও রাক্ষসগণকে পূজা করেন এবং তামসিকরা প্রেত ও ভূতগণের পূজা করেন। সুতরাং শ্রদ্ধা স্বভাব দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। যিনি যেমন শ্রদ্ধাসম্পন্ন তিনি তেমনিই।

