চিন্তার বহিঃপ্রকাশ
শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতে আছে, যে যাকে চিন্তা করে, সে তার সত্তা পায়। শ্রীমতী শ্যামকে ভেবে ভেবে সমস্ত শ্যামময় দেখলে, আর নিজেকেও শ্যাম বোধ হল। আমাদের বেদান্ত শাস্ত্রের শিক্ষা—মানবের মন তার শরীরকে বর্তমান আকারে পরিণত করেছে, মন সৃষ্টি করে এই শরীর এবং তীব্র ইচ্ছা বা বাসনার সাহায্যে তার জীবনের প্রতি মুহূর্তে তাকে ভেঙেচুরে নতুনভাবে গঠন করছে। তীব্র ইচ্ছা বা বাসনা চিন্তারই অভিব্যক্তির এক রূপ। প্রত্যেক মানুষ তার চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। সে যে কাজটি করে তার পশ্চাতে থাকে তার চিন্তা। অর্থাৎ মানুষ যা চিন্তা করে সেটিই তার কর্মের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়। তার বাহ্যিক চালচলন আচার ব্যবহার এমনকি শারীরিক গঠন পর্যন্ত তার চিন্তার অনুসারী হয়। একজন মানুষকে অপর একজন মানুষ থেকে চিনে নিতে অসুবিধা হয় না কারণ তার ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য। আর এই বৈশিষ্ট্যের পশ্চাতে চিন্তার প্রভাবই সর্বাপেক্ষা অধিক। যদিও কিছুটা জাতিগত বংশগত এবং পরিবেশগত ইত্যাদি প্রভাবের ভূমিকাও থাকে। কিন্তু চিন্তার প্রভাব অপরিসীম। একবার শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, তোমাদের যাত্রাওয়ালাদের ভেতর যারা কেবল মেয়ে সাজে তাদের প্রকৃতি ভাব হয়ে যায়। মেয়েকে চিন্তা করে মেয়ের মত হাবভাব সব হয়। সেই রূপ ঈশ্বরকে রাত দিন চিন্তা করলে, তাঁরই সত্তা পেয়ে যায়। শংকরাচার্যের বিবেক চূড়ামণিতে আছে—সতি সক্তো নরো যাতি সদভাবং হ্যেকনিষ্ঠয়া। / কীটকো ভ্রমরং ধ্যায়ন্ ভ্রমরত্বায় কল্পতে।। অর্থাৎ সৎস্বরূপব্রহ্মবিচারে তৎপর মানব একনিষ্ঠার ফলে অবশ্যই ব্রম্ভভাব প্রাপ্ত হন। কাঁচ প্রকার দ্বারা ধৃত তেলাপোকা যেমন কাঁচ পোকার চিন্তা করতে করতে কাঁচ পোকা হয়ে যায়। শ্রীমৎ ভাগবতেও একই কথা উল্লেখ করা আছে। অর্থাৎ একথা বলা হয় মানুষের ক্ষেত্রেও ঈশ্বরের চিন্তা করতে করতে মানুষের ঈশ্বরে রূপান্তরিত না হওয়ার পক্ষে কোন যুক্তি নেই। বরং ঈশ্বরের চিন্তা করতে করতে সাধক ঈশ্বরের স্বরূপতা লাভ করবেন এটাই যুক্তিযুক্ত।

