রেঙ্গুনরত্ন শরৎচন্দ্র
খ্যাতনামা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র সাহিত্য- সাধনায় যেভাবে সিদ্ধহস্ত ছিলেন, সংগীত সাধনাতেও তিনি সেই রূপ সিদ্ধকন্ঠ ছিলেন এ কথা রেঙ্গুনপ্রবাসী বাঙালীগণ ছাড়া আর কেউ জানে না। কারণ বর্মা থেকে শরৎচন্দ্র ফিরে এসে একেবারে কণ্ঠরোধ করে শুধু লেখনীই ধারণ করেছিলেন। তিনি একাধারে কথাশিল্পী ও সুরশিল্পী ছিলেন বললে কেউ বিশ্বাস করত না। বাংলা সাহিত্যে তিনি সাহিত্য সম্রাট, অপরাজেয় কথাশিল্পী, নির্যাতিতের ও লাঞ্ছিতের দরদী বন্ধু, মনস্তত্ত্ববিদ্ , সমাজ সংস্কারক, নব্য বাংলার স্বাধীনচিন্তা প্রবর্তক ও স্বদেশসেবক প্রভৃতি অনেক উপনামে ভূষিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর রেঙ্গুনরত্ন এই উপনামটি বঙ্গের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কবি নবীনচন্দ্র সেন তাঁর সুমধুর কণ্ঠ সংগীতে প্রীত হয়ে তাকে প্রদান করেছিলেন এবং এ কথা বোধহয় শরৎচন্দ্র ইচ্ছা করেই গোপন রেখেছিলেন। কারণ শরৎচন্দ্র হয়তো মনে করেছিলেন, এই উপাধিটির ইতিবৃত্ত শুনে যদি তাঁকে সকলে গান করতে অনুরোধ করেন, তাহলে তাঁর নীরব সাহিত্যচর্চায় ব্যাঘাত ঘটবে, তাই এই নীরবতা। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ফাল্গুন মাসে রেঙ্গুন রামকৃষ্ণ সেবক সমিতির উদ্যোগে শ্রীরামকৃষ্ণের জন্ম মহোৎসব পালিত হয়েছিল। এই উপলক্ষে রামকৃষ্ণ মিশনের মাদ্রাজ মঠের অধ্যক্ষ স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ রেঙ্গুন শহরে এলেন। সাধকশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ রামকৃষ্ণানন্দের সৌম্যমূর্তি খানি দেখে শরৎচন্দ্র তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন, তাঁর সঙ্গ লাভ করে জ্ঞানপিপাসার শান্তি হতে পারে ভেবে যে কয়দিন মহারাজ রেঙ্গুনে ছিলেন প্রতিদিন সময় বুঝে তাঁর নিকট এসে শরৎচন্দ্র নির্জনে তত্ত্বকথা শ্রবণ করে ধন্য হতেন। একদিন একটি সভায় মহারাজের অনুরোধে শরৎচন্দ্র সাধুসঙ্গের পুণ্যময় প্রভাবে আবিষ্ট হয়ে দুই একটি রামকৃষ্ণ সংগীত গেয়ে শোনালেন। তাঁর কন্ঠে রামকৃষ্ণের গান শুনে মহারাজ প্রীত হয়েছিলেন। ঘটনাক্রমে একদিন একটি সভায় কবিবর নবীনচন্দ্র, কবির পুত্র নির্মল চন্দ্র এবং শরৎচন্দ্র স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। সেই সভাতেও শরৎচন্দ্র সংগীত পরিবেশন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কবি নবীনচন্দ্র সংগীতের রসমাধুর্যে বিভোর হয়ে বললেন, আপনার গানের ভাব উদ্দীপনায় সেই চির সুন্দরকে মনে করিয়ে দেয়, রেঙ্গুন শহরে এমন রত্ন লুকানো ছিল জানতাম না, আমি আজ আপনাকে "রেঙ্গুনরত্ন" উপাধি দিলাম।

