সব পথ এসে মিলে গেল শেষে
বাপ্পাদিত্য মণ্ডল
শিক্ষক,
পঞ্চমহুলী প্রাথমিক বিদ্যালয়
আমরা প্রায়শই 'আধ্যাত্মিকতা'-কে ধর্ম, ঈশ্বর, পূজা-আর্চা, ধ্যান-যোগের সঙ্গে সম্পৃৃক্ত করে তার বিশালতা খর্ব করে থাকি। ধ্যান-ভক্তিই যে আধ্যাত্মিকতার একমাত্র পথ, এটি আংশিক সত্য। 'আধ্যাত্মিকতা'-র স্পর্শ পাওয়ার যা যা পথ এই বিশ্বসংসারে বর্তমান, নিঃসন্দেহে ঈশ্বরভক্তি তার মধ্যে একটি জনপ্রিয় পন্থা, কিন্তু একমাত্র পন্থা নয়। সুর, কবিতা, শিল্প, বিজ্ঞানসাধনা এই সবকিছুই আমাদের চেতনাকে সক্রিয় করে। আধ্যাত্মিকতা সক্রিয় চেতনার সর্বোচ্চ পর্যায়, যেখানে সাময়িকভাবে হলেও ব্যক্তি-চেতনা অনন্ত চেতনাকে ছুঁয়ে আসে। যেখানে বোঝ হালকা হয়, বাঁধন শিথিল হয়, চেতনা চিন্তামুক্ত হয়। আমরা কখনও কখনও আধ্যাত্মিকতার স্বাদ কিছুক্ষণের জন্য হলেও উপভোগ করেছি, কিংবা কাছাকাছি পর্যায়ে নিজের চেতনাকে নিয়ে যেতে পেরেছি। এমন কোনো সুর যা আপনি শুনেছেন, শুনতে শুনতে এমন জায়গায় পৌঁছে গেছেন যে গানের কথা-সুর-যন্ত্রানুসঙ্গ সমস্ত কিছু গৌণ হয়ে পড়েছে। শুনেও শুনছেন না কিছুই, শুধুই নিখাদ প্রশান্তি। চোখ বেয়ে জল পড়ছে... আপনি বুঝতে পারছেন বা পারছেন না। আপনি শুনছেন, কিন্তু শুনছেন না। এমন একটা মানসিক পর্যায় যেখানে সব শান্ত, সেই প্রশান্তি আপনি অনুভব করছেন, কিন্তু জাগতিক সমস্ত কিছুতে অপনার চেতনা অবর্তমান! এমন হয়, ক্ষণিকের জন্য হলেও হয়।
এই যে অনন্ত মহাকাশ, জাগতিক অভ্যাসে গঠিত সংকীর্ণ মননের ফিতা দিয়ে যার বিস্তার কল্পনাতেও পরিমাপ করা যায় না, যার মধ্যে অনন্ত সংখ্যক ছায়াপথ, নীহারিকা, নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ... এই সবকিছুর মাঝে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপাদান হয়ে আমরাও আছি। সৃষ্টির এই বিশালতায় যে যোগসূত্রে কৃষ্ণগহ্বর গ্রহাণুর সঙ্গে সংযুক্ত, সেই একই নিয়মে, একই সূত্রে আমরাও যুক্ত। অনন্তের মাঝে কিছুই খাপছাড়া নয়, সৃষ্টি-বিনাশের এই নিরন্তর খেলায় আমরা দর্শক নই, বরং অংশগ্রহণকারী। তাই আমরা যদি এই মহাজাগতিক সংযোগের সাথে ক্ষণিকের জন্য হলেও একাত্ম হতে পারি তবে কিছুটা আধ্যাত্মিকতার স্বাদ পেতে পারি, পন্থা যা-ই হোক না কেন!

