সর্বশেষ খবর
মুসলিম নারীর হাতে প্রথম ভোগ এই দুর্গাপুজোয়
প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, মুর্শিদাবাদ: যেখানে ধর্মের নামে বিভেদের দেওয়াল তোলার চেষ্টা হয় চারিপাশে, সেখানেই সম্প্রীতির এক অনন্য নজির সৃষ্টি করে চলেছে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর মহকুমার জনার্দনপুর গ্রাম। এখানকার শরৎচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির দুর্গাপুজো শতাব্দী প্রাচীন। আর এই পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, দেবীর প্রধান ভোগ তৈরি করেন গ্রামেরই কোনও মুসলিম পরিবারের সদস্য। সেই ভোগ মা দুর্গাকে উৎসর্গ করার পরেই পুজোর অন্যান্য বাকি আচার-অনুষ্ঠান শুরু হয়। তবে রীতির দিক থেকে এই পুজো বাকি পাঁচটা পুজোর চেয়ে অনেকটাই আলাদা—এখানে কোনও পুষ্পাঞ্জলি বা আরতি হয় না। যুগ যুগ ধরে এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখেই মহাসমারোহে উদযাপিত হয়ে আসছে জনার্দনপুরের এই পুজো।
এই পুজোর বয়স ৩৫০ বছরেরও বেশি। একসময় সাগরদিঘির জমিদার ছিলেন শরৎচন্দ্র। পরে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের আদি বাসভূমি সাগরদিঘি ছেড়ে তাঁরা চলে আসেন জনার্দনপুর বহড়া গ্রামে। তখন মুর্শিদাবাদের (Murshidabad) বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল ঘন বনজঙ্গলে ঢাকা। আর সেই জঙ্গলে ছিল ডাকাতদের আনাগোনা। কথিত আছে, একদিন জমিদারির কাজ সেরে জঙ্গলের পথ ধরে বাড়ি ফিরছিলেন শরৎচন্দ্র। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ে ডাকাতদের পুজো করা দুর্গামূর্তি। সেই রাতেই নাকি স্বপ্নাদেশ দেন দেবী। তাঁর নির্দেশে ডাকাতদের পুজো করা সেই মূর্তি নিয়ে আসা হয় বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে। শুরু হয় পুজো। কিন্তু সেখানেই শেষ নয় গল্পের। আবার এল স্বপ্নাদেশ। এবার নির্দেশ—পুজোর প্রথম ভোগ দিতে হবে কোনও মুসলিম পরিবারকে। সেই সময়ে গ্রামে থাকতেন মাত্র একজন মুসলিম মহিলা। সকলের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘লোকার মা’ নামে। তাঁকে পুজোর ভোগ দিতে বলা হলে প্রথমে তিনি রাজি হননি। কারণ, যে মহিলার নিজেরই দু’বেলা ভাত জোটে না, তিনি আবার দেবীর পুজোর ভোগ দেবেন কী করে? তারপর ফের এল দেবীর স্বপ্নাদেশ। এবার আর পিছিয়ে থাকেননি লোকার মা। জঙ্গল থেকে কোদার চাল কুড়িয়ে এনে সেই চাল দিয়ে নাড়ু তৈরি করেছিলেন তিনি। সেই ভোগই প্রথমে উৎসর্গ করা হয়েছিল দেবীকে। সেই থেকে নিয়মটা আর বদলায়নি। আজও কোনও মুসলিম পরিবারের তৈরি ভোগ প্রথমে দেবীকে উৎসর্গ করা হয়। তার পরে অন্যরা ভোগ দেন। কোদার চালের সেই স্মৃতিই পুজোর সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে আর এক নাম—‘কোদা খাকি দুর্গা’। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই নিয়ম আজও একইভাবে পালন করে চলেছে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার।

