বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
হট টপিক

বাঙালির হাসির রাজা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য

প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট, ২০২৬
বাঙালির হাসির রাজা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

নিজস্ব প্রতিনিধি: বাঙালিকে হাসানো সহজ কাজ নয়, তবে যিনি কেবল মুখের অভিব্যক্তি আর অসামান্য সংলাপক্ষেপণে আবালবৃদ্ধবনিতাকে দশকের পর দশক ধরে হাসিয়ে এসেছেন, তিনি কৌতুক সম্রাট ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ, ২৬ আগস্ট, এই প্রবাদপ্রতিম অভিনেতার জন্মদিন। উত্তম-সুচিত্রার সোনালী যুগে সমান্তরালভাবে নিজের একছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন এই ক্ষণজন্মা শিল্পী। শতবর্ষ পেরিয়েও বাঙালির ড্রয়িংরুমে আজও তাঁর কদর বিন্দুমাত্র কমেনি। দুঃখের দিনে বা একাকীত্বের অবসরে আজও বাঙালির একমাত্র ধন্বন্তরি ওষুধ হলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। সিনেমা থেকে থিয়েটার, রেডিওর নাটক থেকে অডিও ক্যাসেট— বিনোদনের সব মাধ্যমেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজা।

১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার ঢাকার বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন ভানু। বাবা-মা নাম রেখেছিলেন সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু ডাকনাম 'ভানু'র আড়ালেই ঢাকা পড়ে যায় তাঁর পোশাকি নাম। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল ও পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তাঁর মধ্যে এক সহজাত অভিনয় প্রতিভা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। দেশভাগের যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়ের পর তিনি পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে আসেন এবং চারু অ্যাভিনিউয়ের বাসিন্দা হন। কলকাতায় এসে প্রথম দিকে জীবিকার তাগিদে সরকারি ‘আয়রন অ্যান্ড স্টিল কন্ট্রোল’ অফিসে চাকরি শুরু করেন। কিন্তু যাঁর রক্তে বইছে অভিনয়ের নেশা, তাঁকে কি আর ফাইলের বাঁধনে আটকে রাখা যায়? চাকরির ফাঁকেই চলতে থাকে থিয়েটার ও অভিনয়ের অদম্য প্রচেষ্টা। ১৯৪৭ সালে ‘জাগরণ’ ছবির মাধ্যমে রুপোলি পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে।
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় মানেই কেবল নিছক কমেডি বা হাসি-মজাই নয়, তাঁর জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে গভীর দেশপ্রেম এবং রাজনৈতিক সচেতনতা। কৈশোরে তিনি ঢাকার কুখ্যাত বিপ্লবী সংগঠন ‘অনুশীলন সমিতি’র সাথে যুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে স্বদেশি আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি বহুবার পুলিশের তাড়া খেয়েছেন এবং প্রায় এক মাস গৃহবন্দীও ছিলেন। পরবর্তীকালে কলকাতায় এসে তিনি বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে আসা লক্ষ লক্ষ উদবাস্তু মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি সলিল সেনের সঙ্গে মিলে গড়ে তোলেন ‘ক্রান্তি শিল্পী সংঘ’। উদবাস্তুদের কষ্ট তুলে ধরতে এবং তাঁদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে তিনি ‘নতুন ইহুদী’ নাটকে অভিনয় করেন, যা সে যুগে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর এই সমাজ সচেতন ও লড়াকু মানসিকতা পরবর্তীকালে তাঁর বিভিন্ন ছবির অভিনয়ে এবং শাণিত সংলাপে প্রকাশ পেয়েছে।
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে ১৯৫৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিটি একটি মাইলফলক। এই ছবির মাধ্যমেই বাঙালি প্রথম পেয়েছিল তার চিরসবুজ রোমান্টিক জুটি উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনকে। তবে এই ছবির মূল চালিকাশক্তি ছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সুযোগ্য সহযোগী জহর রায়। ছবিতে মেসের বাসিন্দা হিসেবে ভানুর সেই বাঙাল ভাষা এবং বিখ্যাত সংলাপ “মাসিমা, মালপো খামু” আজও বাঙালির মুখে মুখে ফেরে। জহর রায়ের সঙ্গে ভানুর জুটি টলিউডে এক নতুন যুগের সূচনা করে। হলিউডের ‘লরেল-হার্ডি’র মতোই বাংলার ‘ভানু-জহর’ জুটি দর্শকদের হাসির জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যেত। ভানুর গম্ভীর সংলাপের পালটা জহরের চটপটে চোখের অভিব্যক্তি— এই দুইয়ের রসায়ন ছিল অনন্য। ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘আশিতে আসিও না’, ‘পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট’, ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’— একের পর এক ছবিতে ভানু নিজের অভিনয় দক্ষতায় নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
সে যুগে বাংলা সিনেমা জগতের একটি অলিখিত নিয়ম ছিল যে, কমেডিয়ানরা কেবল পার্শ্বচরিত্রেই অভিনয় করবেন। কিন্তু ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় সেই চেনা ছক সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার করে দেন। তিনি যখন সিনেমার মূল চরিত্রে অভিনয় করতেন, তখন হলগুলিতে টিকিটের জন্য হাহাকার পড়ে যেত। ‘ভানু পেল লটারি’ বা ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’-এর মতো ছবিতে তিনি একাই টেনে নিয়ে গিয়েছেন পুরো সিনেমা। তাঁর দুর্দান্ত কমিক টাইমিং এবং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সুখ-দুঃখকে হাসির ছলে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা ছিল ঈর্ষণীয়। তিনি পর্দায় কোনো ভাঁড়ামো করতেন না, বরং অতি সাধারণ এক মধ্যবিত্ত মানুষের চরিত্রকে এমনভাবে তুলে ধরতেন, যার সঙ্গে দর্শকরা সহজেই নিজেদের মেলাতে পারতেন। গম্ভীর মুখে সমাজকে তীব্র ব্যঙ্গ করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর।
ভানুর অভিনয়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল তাঁর খাঁটি ঢাকার বাঙাল ভাষা। দেশভাগের পর কলকাতায় যখন ঘটি-বাঙাল তরজা তুঙ্গে, তখন ভানু নিজের পূর্ববঙ্গের উপভাষাকে এক পরম মর্যাদার আসনে বসিয়েছিলেন। তাঁর মুখের সেই চেনা টান শুনতে মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকত। সিনেমার পাশাপাশি সে যুগে গ্রামোফোন রেকর্ড ও রেডিওর দুনিয়াতেও তিনি ছিলেন একচ্ছত্র সম্রাট। মহালয়ার সকালে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পাশে যেমন বাঙালির শ্রেষ্ঠ পাওনা ছিল, তেমনই পুজোর মুখে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৌতুক নকশার রেকর্ড শোনার জন্য মানুষ চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করত। তাঁর ‘লর্ড ক্লাইভের গাধা’, ‘ভানুর পরীক্ষা’ বা ‘ভানু সিনেমা বানায়’-এর মতো অডিও ক্যাসেটগুলি আজও হাস্যরসের শ্রেষ্ঠ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯৮৩ সালের ৪ মার্চ এই মহান শিল্পী চিরতরে আমাদের ছেড়ে চলে যান। কিন্তু তাঁর শারীরিক প্রস্থান ঘটলেও বাঙালির মন থেকে ভানুর বিদায় অসম্ভব। আজ তাঁর জন্মদিনে রাজ্যজুড়ে তাঁর অজস্র অনুরাগী এবং টলিউডের শিল্পীরা তাঁকে সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছেন। বর্তমানের দ্রুতগতির জীবনযাত্রা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার রিলসের যুগেও ভানুর কমিক ক্লিপিংস বা অডিও রেকর্ড সমানভাবে জনপ্রিয়। বাংলা ছবির ইতিহাসে বহু অভিনেতা এসেছেন এবং গিয়েছেন, কিন্তু কোটি কোটি বাঙালির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অমলিন হাসি ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি ছিলেন, আছেন এবং বাঙালির হাসির রাজা হিসেবে চিরকাল থেকে যাবেন।