খাদ্য সুরক্ষায় আমাদের অধিকার যেমন, দায়িত্বও তেমন
৭ই জুন বিশ্ব খাদ্য সুরক্ষা দিবস উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ।
আজ বিশ্ব খাদ্য সুরক্ষা দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি হয়তো আর পাঁচটা দিনের মতোই আসে। কিন্তু মানুষের জীবনে খাবারের মতো গভীর, ব্যক্তিগত এবং সামাজিক বিষয় খুব কমই আছে। আমরা যখন ভাতের প্রথম গ্রাসটি মুখে তুলি, তখন শুধু খিদে মেটাই না; আমরা পৃথিবীর সঙ্গে, মাটির সঙ্গে, কৃষকের সঙ্গে, জল-হাওয়ার সঙ্গে এক অদৃশ্য সম্পর্কও গড়ে তুলি। অথচ সেই সম্পর্কের ভেতরে কত অনিশ্চয়তা, কত অজানা বিপদ লুকিয়ে থাকে, তা আমরা অধিকাংশ সময় টেরই পাই না।
কয়েকদিন আগে একটা গ্রামে গিয়েছিলাম। বর্ষার আগমনী মেঘ তখন আকাশের গায়ে ধূসর রঙ মেখে দিয়েছে। বিকেলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম ধানের খেতের ধারে। দূরে একজন বৃদ্ধ কৃষক জমিতে কাজ করছিলেন। তাঁর শরীরের হাড়গোড়গুলো যেন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কাছে গিয়ে কথা বলতে তিনি হেসে,কথাপ্রসঙ্গে বললেন, “আমরা ফসল ফলাই, কিন্তু সবাই কি নিরাপদ খাবার খায়?” প্রশ্নটা শুনে আমি চুপ করে গিয়েছিলাম।
আমরা শহরে বসে ভাবি, বাজার থেকে টাটকা শাকসবজি কিনলেই দায়িত্ব শেষ। মাছটা চকচকে হলেই ভালো, ফলটা বড় হলেই ভালো, সবজিটা উজ্জ্বল হলেই ভালো। কিন্তু সেই উজ্জ্বলতার আড়ালে কী আছে? অতিরিক্ত রাসায়নিক? ক্ষতিকর সংরক্ষণ পদ্ধতি? দূষিত জল? নাকি এমন কোনো অদৃশ্য জীবাণু, যাকে চোখে দেখা যায় না? খাদ্য সুরক্ষার আসল প্রশ্নটি সেখানেই। শুধু পেট ভরানো নয়, শরীরের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাই তার মূল কথা।
আমাদের ছোটবেলায় একটা অন্যরকম পৃথিবী ছিল। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে এসে কলের জলে ধোয়া আম খাওয়া যেত। গাছের পাকা পেয়ারা ছিঁড়ে মুখে দিলেই তার গন্ধে মন ভরে যেত। তখন হয়তো বিজ্ঞান এত উন্নত ছিল না, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দূরত্বও এত ছিল না। এখন আমরা প্রযুক্তিতে এগিয়েছি, উৎপাদনে এগিয়েছি, কিন্তু সেই সঙ্গে খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে। পৃথিবী যত দ্রুত বদলাচ্ছে, খাদ্যের যাত্রাপথও তত জটিল হয়ে উঠছে।
একটি ধানের দানার কথা ভাবা যাক। সে জন্ম নেয় মাটিতে। তারপর কৃষকের হাতে বড় হয়। পরে গুদাম, ট্রাক, বাজার, দোকান পেরিয়ে আমাদের রান্নাঘরে পৌঁছায়। এই দীর্ঘ পথের প্রতিটি ধাপেই তার নিরাপত্তা রক্ষা করা জরুরি। কোথাও যদি দূষণ ঘটে, কোথাও যদি অসতর্কতা থাকে, তবে সেই ক্ষতি শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেই এসে জমা হয়। তাই খাদ্য সুরক্ষা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, কেবল কৃষকের দায়িত্ব নয়, কেবল ব্যবসায়ীর দায়িত্বও নয়। এটি একটি সম্মিলিত দায়িত্ব, যেখানে প্রত্যেক মানুষের ভূমিকা আছে।
কিন্তু এই আলোচনার মধ্যে আরেকটি প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। খাদ্য কি শুধু শরীরের প্রয়োজন?
একদিন রাতে শহরের একটি ব্যস্ত রাস্তায় দেখেছিলাম, একটি বাচ্চা ছেলে ডাস্টবিনের পাশে বসে খাবারের খোঁজ করছে। তার চোখে কোনো দর্শন ছিল না, কোনো পরিসংখ্যান ছিল না। ছিল শুধু খিদে। তখন মনে হয়েছিল, খাদ্য সুরক্ষার সবচেয়ে বড় অর্থ হয়তো কেবল নিরাপদ খাবার নয়, বরং মানুষের খাদ্য পাওয়ার অধিকার। পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন খাবার নষ্ট হয়, অন্য প্রান্তে তখন কেউ ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ে। এই বৈপরীত্য আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর একটি।
বিশ্ব খাদ্য সুরক্ষা দিবস তাই শুধু সচেতনতার দিন নয়। এটি আমাদের বিবেকের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা কী খাচ্ছি, কোথা থেকে খাচ্ছি, কীভাবে সংরক্ষণ করছি, কতটা অপচয় করছি—এই সব প্রশ্নের মুখোমুখি করে। আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা তৈরি করতে হলে মাটি, জল, পরিবেশ, কৃষক এবং ভোক্তা—সবাইকে এক সুতোয় বাঁধতে হবে।
আজ যখন রাতের খাবারের টেবিলে বসবেন, একবার থালার দিকে তাকিয়ে দেখবেন। সাদা ভাত, ডাল, মাছ কিংবা সবজি—এসব কোনো সাধারণ বস্তু নয়। এগুলোর ভিতরে আছে মেঘের জল, রোদের উষ্ণতা, মাটির গন্ধ, কৃষকের ঘাম এবং অসংখ্য মানুষের শ্রম। সেই শ্রমের প্রতি সম্মান জানানো মানে শুধু খাবার খাওয়া নয়, খাবারকে নিরাপদ রাখা, অপচয় না করা এবং তার মর্যাদা বোঝা।
হয়তো এভাবেই বিশ্ব খাদ্য সুরক্ষা দিবস আমাদের নতুন করে শেখায়—খাদ্য কেবল জীবনধারণের উপকরণ নয়, এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কেরও ভাষা। আর সেই ভাষা যত নিরাপদ, যত নির্মল হবে, পৃথিবীও তত মানবিক হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই এক অদ্ভুত যাত্রার সহযাত্রী। মাঠের ধানের শিষ থেকে শুরু করে ডাইনিং টেবিলের শেষ গ্রাস পর্যন্ত। সেই যাত্রাপথকে নিরাপদ রাখা মানে আসলে নিজেদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখা। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত তার খাওয়া খাবারের মধ্যেই নিজের আগামী দিনের গল্প লিখে যায়।

