হট টপিক
তৃণমূল বা অন্য দল থেকে যোগদানের ক্ষেত্রে কি কোনও 'ছাঁকনি' রাখবে কংগ্রেস?
প্রকাশিত: ৯ জুন, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব পটপরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যে তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের একক ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল, আজ তা তীব্র ভাঙনের মুখে। ফলাফলের পর দেখা যাচ্ছে, সকালে যে বিধায়ক বা সাংসদ তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকার বার্তা দিচ্ছেন, বেলা গড়াতেই তিনি দলত্যাগ করছেন। শুধু শীর্ষ নেতাই নন, দলের নিচু স্তরের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও দল ছাড়ার হিড়িক পড়েছে। আর এই দলত্যাগীদের বড় অংশেরই গন্তব্য এখন বিধানসভায় মাত্র ২টি আসন পেয়ে পুনরুজ্জীবিত হওয়া কংগ্রেস বা ‘হাত’ শিবির।
নির্বাচনে মাত্র দুটি আসন পেলেও, তৃণমূলের এই ভরাডুবির পর বাংলায় কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে কোমর বেঁধে নেমেছেন। সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যেও কংগ্রেসকে নিয়ে নতুন আশা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের ঘর ভাঙা বিধায়ক, সাংসদ এবং কর্মীদের নিজেদের দিকে টেনে এনে সংগঠনকে শক্তিশালী করার এক সুবর্ণ সুযোগ এসেছে কংগ্রেসের সামনে। কিন্তু এই বিপুল যোগদানের ঢেউয়ের মাঝেই রাজনৈতিক মহলে একটি বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে— দলবদলের এই স্রোতে ভেসে যাওয়ার সময় কংগ্রেস কি কোনও 'ছাঁকনি' বা বাছাই প্রক্রিয়া রাখবে? নাকি ক্ষমতার লোভে আসা সবাইকে বিনাশর্তে দলে জায়গা দেওয়া হবে?
কংগ্রেসের বর্তমান নেতৃত্বের সামনে এখন এক কঠিন পরীক্ষা। একদিকে, শূন্য থেকে বা মাত্র ২টি আসন থেকে দলকে রাজ্যে একটি শক্তিশালী বিরোধী বা বিকল্প শক্তি হিসেবে খাড়া করতে গেলে দ্রুত লোকবল ও সংগঠনের বিস্তার প্রয়োজন। সেই দিক থেকে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ ও অভিজ্ঞ নেতাদের যোগদান কংগ্রেসের পালে হাওয়া দেবে। কিন্তু অন্য পিঠে রয়েছে এক বড় বিপদ। যে সব নেতা বা কর্মী আজ তৃণমূলের ক্ষমতার দিন শেষ দেখে কংগ্রেসের দরজায় ভিড় করছেন, তাঁদের ভাবমূর্তি ও সততা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। গত এক দশকে তৃণমূলের অনেক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, তোলাবাজি বা কাটমানি খাওয়ার যে অভিযোগ সাধারণ মানুষ তুলেছিল, সেই সমস্ত নেতাদের যদি কংগ্রেস আজ নির্বিচারে দলে নিয়ে নেয়, তবে দলের নিজস্ব ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত হতে পারে।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কংগ্রেস যদি কেবল সংখ্যা বাড়াতে ‘ছাঁকনি’ ছাড়া সবাইকে দলে নেয়, তবে তা হবে আত্মঘাতী। কারণ, বাংলার মানুষ তৃণমূলের যে অপশাসনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে, সেই অপশাসনের কারিগররাই যদি রাতারাতি খোলস বদলে কংগ্রেসের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তবে সাধারণ মানুষের মোহভঙ্গ হতে সময় লাগবে না। মানুষ তখন কংগ্রেসকেও একই মুদ্রার পিঠ বলে গণ্য করবে।
তাই ঘুরে দাঁড়ানোর এই লড়াইয়ে কংগ্রেসকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ‘ছাঁকনি’ নীতি ব্যবহার করতে হবে। যারা আদর্শগতভাবে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হতে চান এবং যাদের বিরুদ্ধে কোনও দুর্নীতির দাগ নেই, তাঁদেরই কেবল জায়গা দেওয়া উচিত। ক্ষমতার সুবিধাবাদী রাজনীতির চেয়ে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ওপর ভিত্তি করে দল গঠন করলে, তা হয়তো ধীরগতির হবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা কংগ্রেসকে বাংলার মাটিতে আবার শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে সাহায্য করবে। সংখ্যার চেয়ে স্বচ্ছতার এই লড়াই-ই ঠিক করবে আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ কী হবে।

