বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
হট টপিক

অবগাহন-এর ইউরেকা

প্রকাশিত: ১৪ জুন, ২০২৬
অবগাহন-এর ইউরেকা
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

আন্তর্জাতিক বাথ ডে-তে জলের কাছে মানুষের ফিরে আসার গল্প

১৪ জুন আন্তর্জাতিক বাথ ডে। দিনটির সূত্রপাত একটি কিংবদন্তি মুহূর্তকে ঘিরে। প্রাচীন গ্রিসের বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস নাকি স্নানের টবে বসেই বিজ্ঞানের সূত্রের রহস্য বুঝতে পেরেছিলেন। জল উপচে পড়ার দৃশ্য দেখে তাঁর মনে হঠাৎ জ্বলে উঠেছিল সমাধানের আলো। আনন্দে তিনি ছুটে বেরিয়ে চিৎকার করেছিলেন—“ইউরেকা!” অর্থাৎ, “পেয়ে গেছি!”

গল্পটি ইতিহাসের নির্ভুল দলিল হোক বা না হোক, তার মধ্যে একটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। মানুষ বহু যুগ ধরেই লক্ষ্য করেছে, জলের মধ্যে নেমে গেলে মন অন্যরকম হয়ে যায়। চিন্তার গতি বদলে যায়। শরীরের সঙ্গে সঙ্গে যেন মনেরও কোনও অদৃশ্য ধুলো ধুয়ে যায়। আর্কিমিডিসের ইউরেকা তাই কেবল বিজ্ঞানের বিজয়গাথা নয়; সেটি মানুষের সঙ্গে জলের প্রাচীন সম্পর্কেরও এক অনন্ত প্রতীক।

জল পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ পদার্থগুলির একটি। অথচ মানুষের জীবনে তার ভূমিকা সবচেয়ে অসাধারণ। জন্মের আগেই মাতৃজঠরের তরল পরিবেশে আমাদের প্রথম অস্তিত্বের সূচনা। জন্মের পরে প্রথম কান্না, প্রথম তৃষ্ণা, প্রথম শুচিতা—সবকিছুর কেন্দ্রে জল। তাই হয়তো পৃথিবীর প্রায় সমস্ত সভ্যতা, জলের মধ্যে কেবল একটি প্রাকৃতিক উপাদান নয়, এক ধরনের আধ্যাত্মিক উপস্থিতিও খুঁজে পেয়েছে।

ভারতীয় সভ্যতার দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে নদী কেবল নদী নয়; দেবী। গঙ্গা, যমুনা, নর্মদা, গোদাবরী—তাঁদের জলে অবগাহন মানে শুধু শরীর ভেজানো নয়, আত্মাকে শুদ্ধ করার চেষ্টা। কুম্ভমেলায় লক্ষ লক্ষ মানুষের সমবেত স্নান, মকর সংক্রান্তির গঙ্গাসাগর, কিংবা ভোরের বারাণসীর ঘাট—সব জায়গাতেই জলের সঙ্গে মানুষের এক গভীর আধ্যাত্মিক সংলাপ ঘটে।

প্রাচীন শাস্ত্রে স্নানকে দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুশাসন হিসেবে দেখা হয়েছে। পূজার আগে স্নান, তীর্থস্নান, উৎসবের স্নান—সবকিছুর মধ্যেই একটি ধারণা কাজ করেছে: জল মানুষের ভিতরকার অশুচিতা, ক্লান্তি এবং অস্থিরতাকে দূর করে।

বাংলার জীবনেও জলের সঙ্গে এই সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত অন্তরঙ্গ। শহুরে প্রজন্মের পক্ষে আজ কল্পনা করা কঠিন, কিন্তু একসময় বাংলার পুকুরঘাট ছিল সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ভোরে মহিলারা কলসি নিয়ে যেতেন, দুপুরে ছেলেরা সাঁতার কাটত, বিকেলে চলত আড্ডা। পুকুরের ঘাটে বসে কত সম্পর্কের শুরু, কত গল্পের জন্ম, কত প্রেমের প্রথম চাউনি—তার কোনও ইতিহাস লেখা নেই।

আমার মনে হয়, বাংলার গ্রামজীবনের সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলির একটি হল দুপুরবেলার পুকুর। চারপাশে নিস্তব্ধতা। কেবল পাখির ডাক, দূরে বাঁশবনের হাওয়া, আর জলের উপর সূর্যের ভাঙা ভাঙা আলো। ঘাটের সিঁড়িতে বসে কেউ মাথায় জল ঢালছে। কেউ বা চুপ করে ভেসে আছে। পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা থেকে সামান্য দূরে সরে যাওয়ার সেই ক্ষমতা জলের ছিল।

আজকের নগরসভ্যতায় সেই সময় আর কোথায়? বাথরুমের ঝরনা খুলে পাঁচ মিনিটে স্নান সেরে অফিসে বেরিয়ে পড়তে হয়। সময়ের অভাব আমাদের জীবনকে যেমন দ্রুত করেছে, তেমনই জলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককেও সংকুচিত করেছে। তবু আশ্চর্যের বিষয়, আধুনিক মানুষের ব্যস্ত জীবনেও স্নান এমন একটি মুহূর্ত, যখন সে কিছুক্ষণের জন্য নিজের সঙ্গে একা থাকে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্নানের ঐতিহ্য এই কারণেই এত বৈচিত্র্যময় এবং আকর্ষণীয়।প্রাচীন রোমে জনস্নানাগার ছিল সামাজিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র। সেখানে মানুষ শুধু স্নান করত না; রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করত, সাহিত্য পড়ত, ব্যবসার কথাবার্তা বলত। রোমান বাথ ছিল এক ধরনের নাগরিক সংস্কৃতির প্রতীক।

তুরস্কের হামাম সংস্কৃতিতেও একই রকম সামাজিকতা দেখা যায়। বাষ্পে ভরা বিশাল কক্ষে মানুষ ধীরে ধীরে শরীরকে শিথিল করে, তারপর জলের মাধ্যমে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করে। বহু শতাব্দী ধরে হামাম কেবল স্নানের স্থান নয়, মানুষের মিলনস্থল হিসেবেও কাজ করেছে।

জাপানে আবার স্নান এক বিশেষ নন্দনতত্ত্বের অংশ। পাহাড়ি অঞ্চলের উষ্ণ প্রস্রবণের জলে ডুবে থাকা জাপানি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। বাইরে তুষারপাত হচ্ছে, চারপাশে পাইনবন, আর মানুষ উষ্ণ জলে নিশ্চুপ বসে আছে। সেখানে স্নান যেন প্রকৃতির সঙ্গে কথোপকথনের একটি উপায়।

ফিনল্যান্ডে Sauna বাথের উত্তাপ থেকে বেরিয়ে বরফশীতল জলে ডুব দেওয়ার প্রথা বহু পুরোনো। শুনতে অবাক লাগলেও, তাদের বিশ্বাস এতে শরীর ও মন উভয়ই নতুন শক্তি পায়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন রীতি থাকলেও মূল অনুভূতিটি একই—জল মানুষকে পুনর্নবীকরণ করে।

বিজ্ঞানও আজ সেই অভিজ্ঞতার অনেকখানি ব্যাখ্যা দিতে পারে। উষ্ণ জলে স্নান পেশির টান কমাতে সাহায্য করে। শরীরকে শিথিল করে। অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক চাপও হ্রাস পায়। দিনের শেষে গরম জলের স্নান ঘুমের প্রস্তুতিতে সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে ঠান্ডা জল অনেক সময় সতেজতা ও সজাগতার অনুভূতি বাড়ায়।

কিন্তু মানুষের স্নানের অভিজ্ঞতা কেবল শারীরবিজ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাথরুমের দরজা বন্ধ হলে বাইরের পৃথিবী সাময়িকভাবে দূরে সরে যায়। ফোন, মিটিং, ট্রাফিক, দায়িত্ব—সবকিছু কয়েক মিনিটের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। মানুষ তখন কেবল নিজের শরীরের শব্দ শুনতে পায়। জলের ধারা শুনতে পায়। সেই নির্জনতায় মনও ধীরে ধীরে অন্য ছন্দে চলতে শুরু করে। সম্ভবত এই কারণেই বহু শিল্পী, লেখক এবং বিজ্ঞানী স্বীকার করেছেন যে তাঁদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা এসেছে স্নানের সময়। মন যখন চাপমুক্ত হয়, তখন চিন্তার নতুন পথ খুলে যায়। আর্কিমিডিসের ইউরেকা তার সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ মাত্র।

আমাদের প্রত্যেকের জীবনেও এমন ছোট ছোট ইউরেকা আছে। কোনও সমস্যার সমাধান হঠাৎ মাথায় এসে যাওয়া। কোনও সম্পর্ককে নতুনভাবে বুঝতে পারা। বহুদিনের ক্লান্তির পরে নিজের ভিতরে আবার শান্তি খুঁজে পাওয়া। এগুলিও এক ধরনের আবিষ্কার। সেই আবিষ্কারের জন্য জল একটি আশ্রয় তৈরি করে।

তবে স্নানের আরেকটি দিকও সমান গুরুত্বপূর্ণ—স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা। মানবসভ্যতার ইতিহাসে নিরাপদ জল এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রসার অসংখ্য প্রাণ বাঁচিয়েছে। নিয়মিত স্নান, হাত ধোওয়া, পরিষ্কার পরিবেশ—এগুলি আজ আমাদের কাছে সাধারণ অভ্যাস হলেও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এগুলির অবদান অপরিসীম।

অর্থাৎ স্নান একসঙ্গে কবিতা এবং বিজ্ঞান। একদিকে স্মৃতি, অন্যদিকে স্বাস্থ্য। একদিকে আচার, অন্যদিকে দৈনন্দিন প্রয়োজন। একদিকে নদীর ঘাটের উচ্ছ্বল শৈশব, অন্যদিকে মহানগরের যৌবন ঝরনা।

আন্তর্জাতিক বাথ ডে তাই কেবল একটি মজার দিন নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জলের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কত গভীর, কত পুরোনো এবং কত বহুমাত্রিক।পৃথিবীর সমস্ত নদী শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়ে মেশে। আর মানুষের সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত ধুলো, সমস্ত ব্যস্ততা দিনের কোনও না কোনও সময় এসে মেশে এক মুঠো জলে। সেই জল কখনও গঙ্গার স্রোত, কখনও বর্ষার বৃষ্টি, কখনও পাহাড়ি উষ্ণ প্রস্রবণ, কখনও বা কলকাতার একটি সাধারণ বাথরুমের ঝরনা।

কিন্তু তার কাজ একই। সে আমাদের ধুয়ে দেয়। শুধু শরীর নয়, কখনও কখনও মনকেও।আর সেই কারণেই আর্কিমিডিসের সেই বহু পুরোনো উচ্ছ্বাস আজও প্রাসঙ্গিক। আমরা হয়তো আর রাস্তায় দৌড়ে বেরিয়ে ‘ইউরেকা’ বলি না। তবু প্রতিদিনের স্নানের শেষে যখন একটু হালকা লাগে, একটু পরিষ্কার লাগে, একটু নতুন লাগে, তখন অজান্তেই আমরা সেই একই আবিষ্কারের অংশ হয়ে উঠি।

জলের কাছে মানুষের ফিরে আসার গল্পের শেষ নেই। কারণ যতদিন মানুষ ক্লান্ত হবে, যতদিন সে শান্তি খুঁজবে, যতদিন সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে চাইবে, ততদিন অবগাহনের জল তার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে—নিঃশব্দে, স্বচ্ছভাবে, অনন্ত ধৈর্যে।