হট টপিক
জেনে নিন কনডমের বিবর্তনের ইতিহাস? কীভাবে তৈরি হয় কনডম?
প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি: মানব সভ্যতার ইতিহাসে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ও কার্যকরী হাতিয়ার হলো কনডম। কিন্তু আজকের বাজারে আমরা যে পাতলা, মসৃণ এবং সুরক্ষিত কনডম দেখতে পাই, তার ইতিহাস ও তৈরির প্রক্রিয়া কিন্তু একদিনে গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে রয়েছে একাধিক বিজ্ঞানীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রযুক্তির বিবর্তন। ১৮৫৫ সালে প্রথম রবার কনডম আবিষ্কার থেকে শুরু করে আজকের অত্যাধুনিক কারখানায় এটি কীভাবে তৈরি হয়, তা এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর কাহিনী।
কীভাবে আবিষ্কার হলো আধুনিক কনডম?
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রাচীনকালে পশুর চামড়া বা মূত্রাশয় দিয়ে কনডম তৈরি হতো। তবে আধুনিক রবার কনডমের যুগের সূচনা হয় ১৯ শতকে।
চার্লস গুডইয়ারের পেটেন্ট (১৮৪৪): বিজ্ঞানী চার্লস গুডইয়ার তাপপ্রয়োগ করে কাঁচা রবারের সঙ্গে গন্ধক (সালফার) মিশিয়ে তা শক্ত ও নমনীয় করার একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন, যাকে 'ভলকানাইজেশন' বলা হয়। ১৮৪৪ সালে তিনি এর পেটেন্ট নেন।
প্রথম রবার কনডম (১৮৫৫): গুডইয়ারের এই প্রযুক্তির ওপর ভর করে ১৮৫৫ সালে বিশ্বের প্রথম রবার কনডম তৈরি হয়। শুরুতে এগুলি অনেক মোটা হতো এবং ধুয়ে বারবার ব্যবহার করা যেত। বহু দশক ধরে পুরুষাঙ্গের আকৃতির একটি ছাঁচে কাঁচা রবার মাখিয়ে এবং পরে রাসায়নিক দ্রবণে ডুবিয়ে এটি প্রস্তুত করা হতো।
জুলিয়াস ফ্রমের নতুন কৌশল (১৯১২): ১৯১২ সালে জুলিয়াস ফ্রম নামে এক জার্মান বিজ্ঞানী কনডম উৎপাদনের এক যুগান্তকারী কৌশল আবিষ্কার করেন। তিনি কাঁচা রবারের দ্রবণে সরাসরি কাচের মণ্ড বা ছাঁচ ডুবিয়ে কনডম তৈরি শুরু করেন। এই পদ্ধতিটি 'সিমেন্ট ডিপিং' (Cement Dipping) নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে রবারকে তরল করার জন্য তার সঙ্গে গ্যাসোলিন বা বেনজিন মেশাতে হতো।
বর্তমানে কীভাবে তৈরি হয় আধুনিক কনডম?
১৯৩০-এর দশকে তরল ল্যাটেক্স (Latex) বা প্রাকৃতিক রবারের কষ আবিষ্কারের পর কনডম তৈরির পুরো প্রক্রিয়াই বদলে যায়। বর্তমানের আধুনিক কারখানায় মূলত 'ল্যাটেক্স ডিপিং' পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় উপায়ে কনডম তৈরি করা হয়।
১. ল্যাটেক্স মিশ্রণ তৈরি: মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের মতো দেশ থেকে সংগৃহীত প্রাকৃতিক ল্যাটেক্সের সাথে বিশেষ রাসায়নিক মেশানো হয়, যা রবারকে দীর্ঘস্থায়ী এবং ইলাস্টিক বা স্থিতিস্থাপক করে তোলে।
২. ডিপিং বা ছাঁচ ডোবানো: কাচ বা সিরামিকের তৈরি শত শত লিঙ্গাকৃতির ছাঁচকে একটি কনভেয়র বেল্টের মাধ্যমে তরল ল্যাটেক্সের ট্যাঙ্কে ডুবানো হয়। ছাঁচগুলি ঘোরার ফলে ল্যাটেক্সের একটি অত্যন্ত পাতলা আস্তরণ ছাঁচের গায়ে লেগে যায়।
৩. ভলকানাইজেশন বা তাপপ্রয়োগ: ল্যাটেক্সের আস্তরণযুক্ত এই ছাঁচগুলিকে একটি বিশাল ওভেনের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। উচ্চ তাপে রবারটি শক্ত ও নিখুঁত রূপ ধারণ করে।
৪. ধোয়া ও শুকানো: ওভেন থেকে বের করার পর কনডমগুলিকে ছাঁচ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলাদা করে জল দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে শুকানো হয়। এই সময় রবারের গুঁড়ো বা ট্যালকম পাউডার ব্যবহার করা হয় যাতে সেগুলি একে অপরের সাথে আটকে না যায়।
৫. ইলেকট্রনিক টেস্টিং (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ): প্রতিটি কনডমকে একটি মেটাল চার্জড রডের ওপর বসিয়ে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ প্রবাহিত করা হয়। যদি কনডমে কোনো অণুবীক্ষণিক ছিদ্র বা ত্রুটি থাকে, তবে বিদ্যুৎ পরিবাহী হয়ে যাবে এবং সেই কনডমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
৬. লুব্রিকেশন ও প্যাকিং: সফলভাবে উত্তীর্ণ কনডমগুলিতে সিলিকন বা জল-ভিত্তিক লুব্রিকেন্ট (এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্লেভার) যোগ করা হয়। সবশেষে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে হাওয়াশূন্য (Vacuum) অবস্থায় তা প্যাক করা হয়।১৮৫৫ সালের সেই মোটা রবারের খণ্ড থেকে আজকের ০.০৩ মিলিমিটারের আল্ট্রা-থিন ল্যাটেক্স কনডম— বিজ্ঞানের এই অগ্রগতি কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী অবদান রেখে চলেছে।

