মহাপ্রভুর রথদর্শন
মহাপ্রভু সন্ন্যাস গ্ৰহণ করেন তাঁর ২৪ বছর বয়সে মাঘ মাসের শুক্লপক্ষে। তারপরেই তিনি পুরীতে পদার্পণ করেন এবং শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবকে দর্শন করেন। তৎকালীন সময়ে পুরীতে অবস্থান করছিলেন পুরীর রাজপণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌম ভট্টাচার্য, যিনি তৎকালীন যুগে বাংলা প্রদেশেরও শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিলেন। কিন্তু যেহেতু তখন বাংলায় নবাব হুসেন শার রাজত্বকাল, তাই এই শ্রেষ্ঠ সংস্কৃত পণ্ডিতকে যথাযথ সম্মান দেননি নবাব। সেই কারণে পণ্ডিত সার্বভৌম ভট্টাচার্য উড়িষ্যায় আসেন এবং এখানে রাজপণ্ডিতের মর্যাদা লাভ করেন। মহাপ্রভু একদিন এই বৈদান্তিক পণ্ডিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, মহাপ্রভুর অন্যতম শিক্ষক গঙ্গাদাস পণ্ডিতেরও শিক্ষক ছিলেন এই সার্বভৌম ভট্টাচার্য। যদিও সার্বভৌম ভট্টাচার্য এই প্রথম শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুকে দেখলেন। মহাপ্রভুকে একজন ভক্ত প্রণাম করলেন এবং সেই ভক্তকে মহাপ্রভু এই বলে আশীর্বাদ করলেন — "তোমার কৃষ্ণচরণে মতি হোক।" এটি শুনে সার্বভৌম ভট্টাচার্য মনে করলেন যে, নিমাই পন্ডিতের ঠিক ঠিক ব্রহ্মজ্ঞান এখনো হয়নি। কারণ কোন ব্রহ্মজ্ঞানী সন্ন্যাসী যখন আশীর্বাদ করেন তখন তিনি কোন দেব- দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন না। সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের উর্দ্ধে। তিনি আশীর্বাদ করেন — " তোমার চৈতন্য হোক"- এই বলে। তাই সার্বভৌম ভট্টাচার্য নিমাইকে বেদান্ত শোনাতে চাইলেন। তিনি যখন ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে চাইলেন, ব্রহ্ম ও জীব অভেদ, তখন মহাপ্রভু তা মান্যতা দিলেন না। তিনি বললেন, সিন্ধু আর তার বিন্দু একই শক্তির অধিকারী নয়। ব্রহ্ম স্বয়ং মায়া সৃষ্টিকারী আর জীব সেই মায়ার অধীন। এইভাবে মহাপ্রভুর ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়ে সার্বভৌম ভট্টাচার্য ক্রমে চিনতে পারলেন যে, নিমাই স্বয়ং রাধা- কৃষ্ণের মিলিততনু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য। এরপরেই শ্রীকৃষ্ণ বিষয়ক দক্ষিণ ভারতের শ্রেষ্ঠ পন্ডিত রামানন্দ রায়ের কথা নিমাইকে বললেন সার্বভৌম ভট্টাচার্য। মহাপ্রভু তখন দক্ষিণ ভারতে গেলেন পরম ভক্ত রামানন্দ রায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। দুই বছর পর ফিরে এসে তিনি পুরীতে শ্রীশ্রীজগন্নাথ দেবের রথযাত্রা দর্শন করেন। অর্থাৎ প্রথমে তিনি ভক্তকে দেখার জন্য ব্যাকুল হলেন তারপর রথদর্শন।

