মানব প্রগতির লক্ষ্য
আমরা অনেকেই আছি যারা নিজেকে খুবই বুদ্ধিমান, জ্ঞানী বলে মনে করি। শুধু মনে করাই নয় অহংকারে মত্ত হই। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, সত্ত্বগুণবিশিষ্ট ত্যাগী, যিনি জ্ঞানী ও সংশয়শূন্য, তিনি অপ্রীতিকর কর্মকে দ্বেষ করেন না, আবার শুভ কর্মেও আসক্ত হন না। এইরকম কর্মীই মেধাবী বা বুদ্ধিমান এবং সব সংশয় থেকে মুক্ত। অশুভ কর্ম তাকে ভয় দেখাতে পারেনা, আবার শুভ কর্মের প্রতিও তার কোন আসক্তি নেই। যোগ দর্শনে বলা হয়েছে, নির্মল বুদ্ধি যখন সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়ে ওঠে, তখনই তা মেধায় রূপান্তরিত হয়। হয়তো কারো মানসিক শক্তি খুবই সাধারণ স্তরের কিন্তু সেই শক্তিকে পরিশীলিত করা যায়, মার্জিত করে তাকে এমন স্তরের টেনে তোলা যায় যখন শেষ পর্যন্ত তা মেধা শক্তিতে পর্যবসিত হয়। অর্থাৎ মেধাবী শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো শুভ ও সূক্ষ্মবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি। বেদে মেধা শক্তির খুব প্রশংসা করা হয়েছে। আমাকে মেধা দাও—এই প্রার্থনামন্ত্র বেদে উচ্চারিত হয়েছে। একসময় আমরা আদিম মানুষ ছিলাম। আজ আমরা সভ্য ও সংস্কৃতিবান হয়েছি। আমাদের ভেতরের মানসিক শক্তিকে পরিবর্তিত করেই এই বিবর্তন সম্ভব হয়েছে। আমাদের অন্তরের পরিবর্তন ঘটিয়েই এটি সম্ভব হয়েছে। ইন্দ্রিয়গুলি এবং মন কিছুটা সংযত হওয়ার ফলেই মানসিক শক্তি শুদ্ধ হয়ে আজ আমাদের এই রূপান্তর, এই প্রগতি। সকল মানব প্রগতির লক্ষ্যই হলো সংশুদ্ধি। আমাদের স্কুল-কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এই সংসুদ্ধির শিক্ষা দেওয়া হয় না। তার ফলে আমরা দেখি তথাকথিত এই শিক্ষা পেয়ে অনেকেই আরো বর্বর হয়ে ওঠে। এতটা বর্বরতা সাধারণ অশিক্ষিত মানুষের মধ্যেও দেখা যায় না। এর প্রধান কারণ প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে না, তার সত্তার গভীরতম দিককে ছুঁয়ে যেতে পারে না। ফলে মন যেমন ছিল ডিগ্রি লাভ করার পরেও তেমনি থেকে যায়, তার কোন উন্নতি এবং শুদ্ধি হয় না। লাভের মধ্যে মাথায় ঢোকে কিছু পুঁথিপড়া জ্ঞান। আর এর জন্য মানুষের মন আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। অর্থাৎ গতানুগতিক শিক্ষায় মনের কোন উন্নতি হচ্ছে না, চিত্তের কোন রূপান্তর ঘটছে না। কিছু তথ্য, কিছু অসংলগ্ন জ্ঞান মস্তিষ্কে ঢুকছে, ওই পর্যন্তই, জীবনের গুণগত মানের কোনো উন্নতি হয়নি। যুক্তি বা জ্ঞান কেবল আমাদের কিছু তথ্য দিতে পারে। কিন্তু সেই জ্ঞানকে কর্মে পরিণত করতে হলে ধৃতি বা প্রবল ইচ্ছা শক্তি চাই। শুধু তাতেও হবে না, সেই ইচ্ছা শক্তিকে সুনিয়ন্ত্রিত ও শুদ্ধ হতে হবে। ব্যক্তি হিসেবে আমাদেরও জ্ঞান, ইচ্ছা এবং ক্রিয়া আছে। তবে যতক্ষণ সেগুলি ইন্দ্রিয়ের বশীভূত থাকবে ততদিন তাদের কার্যকারিতা খুবই সীমিত। এই গুলিকেই আমাদের পরিশুদ্ধ করতে হবে, বিকশিত করতে হবে— এটাই আমাদের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই মূল্যবোধের শিক্ষা যদি দেওয়া না হয় তাহলে সমূহ বিপদ। আগামী দিনেই সমাজ এমন সব বিকৃত মানুষে ভরে যাবে যারা হিংসা দিয়ে তৈরি।

