দাতা ভিক্ষুকের সম্পর্ক
পরাধীন ভারতে রবীন্দ্রনাথ যেকথা লিখেছেন তা আজকের স্বাধীনতার আশি বছর পরেও হুবহু মিলে যায়। প্রজ্ঞাবান মণীষীদের অন্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে পার্থক্য এখানেই। মণীষীদের দূরদৃষ্টির জন্যই তাঁরা কখনো পুরানো হন না। কবিগুরু লিখছেন, আমরা অনেক কল্পনা করি এবং বলে থাকি যে আমরা যা কিছু চাইছি সরকার যদি তা সমস্ত পূরণ করে দেন তাহলে আমাদের প্রীতি ও সন্তোষের অন্ত থাকে না। একথা সম্পূর্ণ অমূলক। এক পক্ষে কেবলই চাওয়া, আর একপক্ষে কেবলই দেওয়া, এর শেষ কোথায়? ঘি দিয়ে আগুনকে কোনদিন নেভানো যায় না, এ কথা শাস্ত্রেই বলে। এইরূপ দাতা-ভিক্ষুকের সম্বন্ধ ধরে যতই পাওয়া যায় বদান্যতার ওপরে দাবি ততই বাড়তে থাকে এবং অসন্তোষের পরিমাণ ততই আকাশে চড়ে ওঠে। যেখানে পাওয়া আমার শক্তির উপরে নির্ভর করে না, দাতার মহত্বের ওপরে নির্ভর করে, সেখানে আমার পক্ষেও যেমন অমঙ্গল দাতার পক্ষেও তেমনি অসুবিধা। কিন্তু যেখানে বিনিময়ের সম্বন্ধ, দানপ্রতিদানের সম্বন্ধ, সেখানে উভয়েরই মঙ্গল। সেখানে দাবির পরিমাণ স্বভাবতই ন্যায্য হয়ে আসে এবং সকল কথাই আপসে মেটার সম্ভাবনা থাকে। সরকারের কাছ থেকে আমাদের যতদূর পাবার তার শেষ কড় পর্যন্ত পেতে পারি, যদি দেশকে আমাদের যতদূর পর্যন্ত দেবার তার শেষ কড়া পর্যন্ত শোধ করে দিতে পারি। যে পরিমানেই দেব সেই পরিমাণেই পাবার সম্বন্ধ দৃঢ়তর হবে। যদিও এই কথাগুলি পরাধীন ভারতের জন্য লেখা হয়েছিল। কিন্তু কি আশ্চর্য! স্বাধীনতার পরে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের পরিবর্তে আমাদের স্বাধীন সরকার তৈরি হয়েছে কিন্তু আমাদের চাওয়া পাওয়ার রীতিনীতি একই থেকে গেছে। নেব বেশি, দেবনা কিছুই। প্রকৃত দেশপ্রেম আমাদের দেশে সুলভ নয়।

