বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
সর্বশেষ খবর

দীপ্র ভট্টাচার্য-এর নিবন্ধ "বাঙালির হৃদমাঝারে রসনা তৃপ্তির গল্প "

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
দীপ্র ভট্টাচার্য-এর নিবন্ধ "বাঙালির হৃদমাঝারে রসনা তৃপ্তির গল্প "
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

বিশ্ব হৃদয় দিবস - ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ।

বাঙালি প্রেম করতে পারে, বিপ্লব করতে পারে, আর পারে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় হজম করার পর বুকে হাত দিয়ে একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলতে। সেই দীর্ঘশ্বাসের পোশাকি নাম অম্বল। কিন্তু ২০২৬ সালের এই ২৯শে সেপ্টেম্বরের সকালে ক্যালেন্ডার যখন আমাদের মনে করিয়ে দেয় আজ বিশ্ব হার্ট দিবস, তখন বাঙালির হৃদয় একটু নড়েচড়ে বসে। দিবসটি আন্তর্জাতিক, কিন্তু বাঙালির ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব একটু অন্যরকম, প্রায় আত্মপরিচয়ের সংকটের মতো। কারণ, বাঙালিই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র জাতি, যে বাঁচার জন্য খায় না, বরং খাওয়ার পর বেঁচে আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে মাঝে মাঝে বুকটা চেপে ধরে। আমাদের কাছে হৃদযন্ত্র কোনো পেশিবহুল রক্ত পাম্প করার সিলিন্ডার মাত্র নয়; ওটা হলো আবেগ, আলসেমি এবং মাছ-মাংসের এক অপূর্ব ত্রিবেণী সঙ্গম। তাই হার্ট দিবসের সকালে যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্তারা ডোন্ট মিস আ বিট বলে ডুগডুগি বাজাচ্ছেন,  বাঙালি তখন ভাবছে, রবিবারের লুচির পর জিলিপিটা না খেলে সপ্তাহের ছন্দটাই তো কেটে যেত! এই যে জীবনের প্রতিটি স্পন্দনকে ভাজাভুজির মোড়কে মুড়ে দেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা, এটাই বাঙালির হৃদরোগের ইতিহাসের মূল ভিত্তিপ্রস্তর।

আসলে বাঙালির সঙ্গে হৃদপিণ্ডের সম্পর্কটা চিরকালই একটু বেশি মাত্রায় কাব্যিক এবং চরম মাত্রায় স্ববিরোধী। আমরা হৃদস্পন্দন বলতে বুঝি উত্তম-সুচিত্রার সাদা-কালো সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক কিংবা কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে কফি হাউসের আড্ডায় টেবিল চাপড়ানোর উথাল-পাথাল ছন্দ। বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলে কার্ডিওভাসকুলার হেলথ, আমাদের সংস্কৃতির উঠোনে তা এসে দাঁড়িয়েছে অ্যান্টাসিড আর ইসবগুলের ভুষির এক অবিচ্ছেদ্য যুগলবন্দিতে। আমরা পাঁঠার মাংসের মেটে চচ্চড়ি অবলীলায় পেটে পুরে দিতে পারি, আর তারপর অত্যন্ত দার্শনিক মুখে বলতে পারি, শরীরটা কেমন যেন আনচান করছে, একটা ওমিপ্রাজল দে তো দেখি! ভয়ের সঙ্গে ভোজনের এই যে রসালো সহাবস্থান, তা পৃথিবীর কোনো চিকিৎসা শাস্ত্রে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। আমরা হার্টকে ভালো রাখার জন্য সকালবেলা ট্যাকসুট পরে দৌড়োই না, আমরা দৌড়োই শুধু ফাঁকা স্পেশাল ট্রেনটা ধরার জন্য কিংবা বাজারের সেরা ইলিশটা অন্য কোনো চতুর খদ্দের কিনে নেওয়ার আগে ব্যাগে পুরতে। আমাদের কাছে শারীরিক পরিশ্রম মানে হলো পুজোর বাজারে ছাতা বগলে বউয়ের পিছু পিছু নিউ মার্কেট চষে ফেলা।

আমাদের এই মহৎ উদরপূর্তির রসনা-সংস্কৃতিতে বিশ্ব হার্ট দিবস এসে প্রতি বছর যেন একটা মৃদু চড় মেরে যায়। কিন্তু আমরা তো বাঙালি, চড় খেয়েও আমরা সর্ষে বাটার রেসিপি খুঁজি। ২০২৬ সালের এই অত্যাধুনিক ডিজিটাল যুগে এসেও আমাদের সচেতনতা থমকে আছে ওই ল্যাবরেটরির রিপোর্টের ট্রাইগ্লিসারাইডের সংখ্যার ওপর। ডাক্তারবাবু যখন গম্ভীর মুখে চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বলেন, একটু হাঁটুন, বাঙালি তখন মনে মনে হিসেব কষে, তা তো হাঁটছিই, সকালবেলা মোড়ের দোকান থেকে কচুরি কিনতে যাওয়া এবং আসার দূরত্বটা কি কম? আমরা সয়াবিন তেলের বোতলে হার্ট ফ্রেন্ডলি বা হৃদবান্ধব লেখা দেখে পরম আশ্বস্ত হই, কিন্তু সেই তেল দিয়েই যখন কড়া ভর্তি করে বেগুনি আর আলুর চপ ভাজা হয়, তখন সেই বন্ধুত্বের বারোটা বেজে তেরোটা হয়ে যায়। হৃদযন্ত্র যে কোনো জড় পদার্থ নয়, এ যে এক অত্যন্ত অভিমানী বন্ধু, যে নীরবে সব অত্যাচার সহ্য করে একদিন হঠাৎ আগাম নোটিশ ছাড়াই ব্রেকডাউন ঘোষণা করে, এই পরম সত্যটা আমরা স্রেফ একটা জোয়ানের জল দিয়ে ধামাচাপা দিতে চাই।

বাঙালির জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আমরা যখন কোনো কিছুকে অবহেলা করি, তখন সেটাকে রীতিমতো শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাই। হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ আমাদের কাছে কোনো পদ্ধতিগত শারীরিক অসুস্থতা নয়, ওটা হলো হঠাৎ করে বুকটা একটু ধড়ফড় করা। বুকে কোনো রকম অস্বস্তি বা ব্যথা হলে আমরা প্রথমে ভাবি ওটা নিশ্চয়ই কাল রাত্রের সেই অতিরিক্ত সর্ষে ইলিশের কারসাজি, কিংবা হয়তো বিয়েবাড়ির পোলাওয়ের অত্যাচার। ইসিজি বা লিপিড প্রোফাইল করার চেয়ে আমরা ঢের বেশি ভরসা রাখি পাড়ার মোড়ের ফার্মেসির সর্বজ্ঞাত দাদার ওপর, যে পেশেন্টকে এক পলক দেখেই স্টেথোস্কোপ ছাড়াই বলে দিতে পারে, আরে দাদা, ও কিছু না, জাস্ট গ্যাস! একটা ক্যাপসুল খেয়ে জল খেয়ে নিন। এই জাস্ট গ্যাস নামক জাতীয় আত্মপ্রবঞ্চনা কত হাজার বাঙালির যে ইহকাল পরকাল এক করে দিয়েছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান কোনো আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নালে পাওয়া যাবে না। আমরা জীবনকে ভীষণ ভালোবাসি, কিন্তু জীবনের পাম্প হাউসটাকে পরিষ্কার আর সচল রাখার দায়টা কেমন যেন অলিখিতভাবে ঈশ্বরের ওপর বা ইনসিওরেন্স কোম্পানির ওপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকি।

এখানেই সেই চিরন্তন চাবুকের মতো প্রশ্নটা চলে আসে—তাহলে উপায় কী? উপায় কি তবে ছাগলের মতো ঘাসপাতা আর সেদ্ধ সবজি চিবিয়ে শতবর্ষ পরমায়ু লাভ করা? বাঙালিকে আনন্দহীন দীর্ঘায়ুর চেয়ে আনন্দময় স্বল্পায়ু ঢের ভালো—এই তত্ত্বটা বোঝানো খুব সহজ, কারণ আমরা আলস্যপ্রসূত আত্মহত্যার পক্ষে যেকোনো কুযুক্তি অবলীলায় খাড়া করতে ওস্তাদ। আমরা ভাবি, যদি রসগোল্লাই না খেলাম, যদি বিরিয়ানির আলুটা দেখেই চোখ ফেরাতে হলো, তবে এই নশ্বর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার বাড়তি উপযোগিতাটুকু কোথায়? কিন্তু মুশকিল হলো, যখন হৃদযন্ত্র সত্যি সত্যি বিগড়ে যায়, তখন সেই তথাকথিত আনন্দটাও আর অবশিষ্ট থাকে না। তখন হাসপাতালের আইসিইউ-র মনিটরের টিকটিক শব্দ আর ডাক্তারের বিলের অঙ্ক আপনার জীবন থেকে সমস্ত রসটুকু নিংড়ে নেয়। তাই ২০২৬ সালের এই প্রযুক্তি-নির্ভর হার্ট দিবসে দাঁড়িয়ে আমাদের একটু নিজেদের ভেতরের আয়নাটার সামনে দাঁড়ানো দরকার। দরকার এটা বোঝা যে, রসগোল্লার রস চিপে খেলেই, এন্ডোক্রিনোলজিস্ট বা মাংসর গ্রেভিটা বাদ দিয়ে খেলেই কার্ডিওলজিস্টের ফিস্ বা এনজিওপ্লাস্টির খরচ এক পয়সাও কমে যায় না। সচেতনতা কোনো ট্যাবলেট নয় যে রাতে খেয়ে ঘুমোলেই সকালে হার্ট ভালো থাকবে।

এবারের প্রচারের মূল স্লোগান ডোন্ট মিস আ বিট বা একটি স্পন্দনও মিস করবেন না—এর মানে শুধু হাতের কবজির পালস রেট গোনা নয়। এর আসল মানে হলো জীবনের প্রতিটি ছোটখাটো ছন্দকে সুস্থভাবে, সজ্ঞানে উপভোগ করা। বুক পকেটে গ্যাসের ট্যাবলেটের বদলে যদি আমরা একটুখানি সঠিক খাদ্যাভ্যাস আর নিয়মিত এক্সারসাইজ বা হাঁটার অভ্যাস জমিয়ে রাখতে পারি, তবেই এই দিবসের সার্থকতা। বাঙালি বাঁচুক তার রসনাতেই, কিন্তু সেই রসনাকে হজম করার জন্য একটা সচল, চর্বিমুক্ত এবং হাসিখুশি হার্ট বড্ড প্রয়োজন। ২০২৬ সালের এই জটিল সময়ে দাঁড়িয়ে আসুন আমরা অন্তত একটা ছোট প্রতিজ্ঞা করি, পাম অয়েল কিংবা একগাদা ঘি কড়াতে ঢালার আগে অন্তত একবার বুকের বাম দিকে হাত রেখে সেই চাপা আর্তনাদটা শোনার চেষ্টা করি। কারণ, হার্ট যদি একবার চূড়ান্তভাবে বলে দেয় গুডবাই, তবে পৃথিবীর কোনো মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ, কোনো রবিঠাকুরের গান বা কফি হাউসের আড্ডা আর আপনাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। পকেটে সামান্য অর্থ আর বুকে একটা সুস্থ হার্ট—এই দুটো ঠিকঠাক সচল থাকলেই বাঙালি চিরকাল বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বলতে পারবে, আরে মশাই, আমরা বাঙালিরা আছি বলেই তো পৃথিবীটা এখনও এত রঙিন!
শুভ বিশ্ব হৃদয় দিবস।

আরও খবর