মানবজীবনের দুটি মার্গ
বৈদিক দর্শনের ও ধর্মের দুটি লক্ষণ—প্রবৃত্তি বা বহির্জগতের কাজকর্ম এবং নিবৃত্তি বা অন্তর্মুখী ধ্যান। এই দুটি লক্ষণই জগতের সুষম সাম্য রক্ষা করে। জীবনের জন্য দুটি বস্তু নিশ্চিত করে—প্রকৃত অভ্যুদয় বা সামাজিক-অর্থনৈতিক কল্যাণ এবং নিঃশ্রেয়স বা আধ্যাত্মিক মুক্তি। মানুষের কল্যাণের জন্য কর্ম ও ধ্যান দুইয়েরই প্রয়োজন। যদি এই দুটির যেকোনো একটি মাত্র থাকে তবে ব্যক্তি মঙ্গল বা সমাজের মঙ্গল কোনোটিই হতে পারে না। আমাদের প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি ও সার্বিক প্রজ্ঞা থেকেই এই লক্ষণ দুটি নির্দেশ করেছিলেন। প্রবৃত্তির মাধ্যমে আর্থিক অবস্থা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করে একটি জনকল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা যায়। কিন্তু একটি মূল্যবোধযুক্ত জীবন, নৈতিকতাপূর্ণ জীবন বলতে যা বুঝি সেটি অর্জন করা যায় একমাত্র নিবৃত্তির মাধ্যমে। এরকম জীবন তৈরি হয় মানবের অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিকতা থেকে। প্রবৃত্তির মধ্য দিয়ে প্রচুর অর্থ, ক্ষমতা এবং অন্যান্য নানা কিছু আসতে পারে কিন্তু কেবলমাত্র ওই প্রবৃত্তিটি থাকলে আর নিবৃত্তি যদি কিছু মাত্র না থাকে তাহলে সমাজ অল্প সময়ের মধ্যেই গভীর সমস্যায় পড়তে বাধ্য হবে। আধুনিক পৃথিবীর বহু দেশ ও জাতি এই কারণেই তীব্র সংকটের মধ্যে আছে। আমাদের দেশেও দুঃখজনক ভাবে এই প্রবণতা ভীষণভাবে তৈরি হচ্ছে। অর্থ, ক্ষমতা ও ভোগসুখ লাভের অশেষ চেষ্টার ফলে মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় এবং ক্রমবর্ধমান হিংসা সমাজকে গ্রাস করছে। প্রবৃত্তির সঙ্গে চাই নিবৃত্তি অর্থাৎ মূল্যবোধ, ধ্যান, যার মাধ্যমে মানুষ তার অন্তরস্থ সদাজাগ্রত দৈবীসত্তার সংস্পর্শে আসে। এক সর্বাঙ্গীণ মানবীয় প্রগতি তখনই আসতে পারে যখন সকল মানুষ প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির মধ্যে সাম্য বজায় রেখে চলবে।

