মাটি পাওয়াই কঠিন
সম্প্রতি কয়েক দশকের মধ্যে আমাদের সমাজে নানা রকম বিষয়ে অবস্থার রূপান্তর ঘটছে। দেশের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হয়েছে, আমাদের একান্নবর্তী পরিবারগুলি ভেঙেছে। তথাপি বলা যায় আমরা যেমন শিক্ষাই পাই-না কেন, আমাদের একেবারে রূপান্তর হওয়া খুব কঠিন। আধুনিক শিক্ষা আমাদের মধ্যে কতকগুলি ভাব এনে দিতে পেরেছে কিন্তু মানুষের সমস্ত অনুকূল অবস্থা এনে দিতে পারেনি। যেমন ইউরোপ বহু বছর আগে প্রধান শিক্ষার গ্রন্থ বাইবেল হাতে পেয়েছে। কিন্তু এখনো ইউরোপ প্রচন্ড অসহিষ্ণু ভাব রক্ষা করে চলেছে। বাইবেলের ক্ষমা ও নম্রতা এখনো তাদের অন্তরকে গলাতে পারেনি। ভারতবর্ষও কয়েক হাজার বছর আগে মহামূল্যবান সম্পদ বেদ, গীতা ,শ্রীমদ্ভাগবদ্ , প্রভৃতি পেয়েছে। তথাপি আজও আমাদের অন্তরের রূপান্তর ঘটেনি বহু মানুষের । কারণ বীজ পাওয়া যায় কিন্তু মাটি পাওয়াই কঠিন। অঙ্গহীন মনুষ্যত্ব আমাদের স্থিতি অবলম্বন করতে বাধ্য করছে। আমাদের মতামত কথাবার্তা এবং আচার অনুষ্ঠান ঠিক সাবালকের মত নয়। সেই জন্য আমরা অত্যুক্তি আড়ম্বর এবং আস্ফালনের দ্বারা আমাদের মানসিক দৈন্য ঢাকবার চেষ্টা করি। এর প্রধান কারণ, বাল্যকাল থেকে আমাদের শিক্ষার সঙ্গে আনন্দ নেই। কেবলমাত্র যা কিছু নিতান্ত আবশ্যক সেগুলিই কণ্ঠস্থ করছি। এর ফলে কোন মতে করে খাবার বিদ্যা অর্জন হয় এবং কাজ চলে যায় মাত্র কিন্তু মনের ও হৃদয়ের বিকাশ লাভ হয় না। হাওয়া খেলে পেট ভরে না, আহার করলে পেট ভরে, কিন্তু আহারটি রীতিমতো হজম করার জন্য হাওয়া খাওয়ার দরকার। তেমনি একটা শিক্ষামূলক পুস্তককে রীতিমতো হজম করতে অনেকগুলি পাঠ্যপুস্তক এর সাহায্য দরকার। আনন্দের সঙ্গে পড়তে পড়তে পড়বার শক্তি অলক্ষিতভাবেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। তখন গ্রহণশক্তি, ধারণা শক্তি ও চিন্তাশক্তি বেশ সহজে এবং স্বাভাবিক নিয়মে শক্তি লাভ করে। অথচ আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে এখনো মানসিক শক্তি হ্রাসকারী নিরানন্দ শিক্ষার ব্যবস্থাই থেকে গেছে। তাই অত্যন্ত উন্নত মানের বীজ থাকা সত্ত্বেও মাটির অভাবে সেই বীজ থেকে বৃক্ষ ও ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

