অবকাশ
জ্ঞানসমুদ্রের এক অনন্য কাণ্ডারি: আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল
প্রকাশিত: ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদন: উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের আকাশ যে ক’জন উজ্জ্বল নক্ষত্রের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও কালজয়ী নাম আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। তিনি ছিলেন একাধারে বিশ্ববরেণ্য দার্শনিক, তুলনামূলক সাহিত্যের আদি প্রবক্তা, সমাজবিজ্ঞানী এবং প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ। তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য এবং জ্ঞানতৃষ্ণার গভীরতা দেখে তৎকালীন পাশ্চাত্য পণ্ডিতমহলও সসম্ভ্রমে তাঁকে কুর্নিশ জানাত। মাইকেল স্যাডলারের মতো দূরদর্শী শিক্ষাবিদ ব্রজেন্দ্রনাথ শীলকে প্রাচীন গ্রিসের বিশ্বখ্যাত দার্শনিক ‘অ্যারিস্টটল’ এবং মধ্যযুগীয় ইউরোপের মহাপণ্ডিত ‘থমাস অ্যাকুইনাসে’র সঙ্গে তুলনা করতে দ্বিধা করেননি। অথচ সমকালের এই চলমান জ্ঞানকোষকে আধুনিক বাঙালি প্রায় ভুলতে বসেছে। ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিনে বাংলার এই জ্ঞানতাপসকে স্বতন্ত্র খবর প্রণাম জানাচ্ছে।
১৮৬৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার হরিপালে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের জন্ম হয়। তাঁর পিতা মহেন্দ্রনাথ শীল ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের এক নামী আইনজীবী এবং দর্শন, গণিত ও ভাষাচর্চায় অত্যন্ত পারদর্শী এক প্রগতিশীল মানুষ। পিতার এই গুণাবলি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন পুত্র ব্রজেন্দ্রনাথ। তবে তাঁর শৈশব এবং কৈশোরের দিনগুলি মোটেই মসৃণ ছিল না। অতি অল্প বয়সেই তিনি পিতৃমাতৃহারা হন। চরম প্রতিকূলতার মধ্যে উত্তর কলকাতায় মামার বাড়িতে বড় হতে থাকেন তিনি। অভাব ও একাকীত্ব তাঁকে ঘিরে ধরলেও তাঁর অদম্য জ্ঞানস্পৃহাকে দমাতে পারেনি। কলকাতার তৎকালীন জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন (যা বর্তমানে স্কটিশ চার্চ কলেজ নামে পরিচিত) থেকে তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে বিএ পাস করেন। ১৮৮৪ সালে মানসিক ও নৈতিক দর্শন (Mental and Moral Philosophy) বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ১৯১০ সালে প্রাচীন হিন্দুদের বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা ও রসায়নের ওপর অভিসন্দর্ভ লিখে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করেন তিনি।
স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়ার সময় ব্রজেন্দ্রনাথের এক অসাধারণ সহপাঠী ও বন্ধু ছিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি পরবর্তীকালে বিশ্বমঞ্চে ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ নামে আত্মপ্রকাশ করেন। এই দুই তরুণ মেধার বন্ধুত্ব ছিল প্রবাদপ্রতিম। দুজনেই নিয়মিত সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সভায় যেতেন এবং দর্শনের নানা জটিল তত্ত্ব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্কবিতর্কে মেতে থাকতেন। পরবর্তী জীবনে নরেন্দ্রনাথ যখন সন্ন্যাস গ্রহণ করে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন, তখনও তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা অটুট ছিল। শুধু বিবেকানন্দই নন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেও আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের সখ্য ছিল অত্যন্ত গভীর। রবীন্দ্রনাথ ব্রজেন্দ্রনাথকে ‘সক্রেটিস বংশের শেষ কুলপ্রদীপ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ পড়ার পর বিশ্ববিখ্যাত আইরিশ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস যখন কিছু মন্তব্য করেছিলেন, তখন ব্রজেন্দ্রনাথ স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন যে ইয়েটস গীতাঞ্জলির মূল ভাবার্থ বুঝতে কিছুটা ভুল করেছেন। বন্ধু ব্রজেন্দ্রনাথের এই গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সত্যনিষ্ঠার প্রতি রবীন্দ্রনাথের আজীবন অসীম শ্রদ্ধা ছিল। এই কারণেই বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলকে বিশ্বভারতীর প্রথম ‘আচার্য’ বা চ্যান্সেলরের আসনে আসীন করেছিলেন।
শিক্ষাবিদ ও প্রশাসক হিসেবে ব্রজেন্দ্রনাথের অবদান সমকালীন শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল। দর্শনে এমএ পাস করার মাত্র তিন বছর পর, মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও রুগ্ন অবস্থায় থাকা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে ১৮৮৭ থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত টানা এক দশক রক্ত জল করা লড়াই লড়েছিলেন এই তরুণ অধ্যক্ষ। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও আধুনিক শিক্ষাদানের পদ্ধতির কারণে কৃষ্ণনাথ কলেজ তৎকালীন বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলেজে পরিণত হয়। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রথম ‘উদ্বোধনী চেয়ার’ অলঙ্কৃত করেন। ১৯২১ সালে তিনি মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘ নয় বছর ধরে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। দক্ষিণ ভারতের শিক্ষা বিস্তারে তাঁর এই অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘স্যার’ উপাধিতে ভূষিত করে।
আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের মেধার ব্যাপ্তি কেবল দর্শন বা শিক্ষাদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একাধারে বহুভাষাবিদ ও বহুবিদ্যাবিশারদ পণ্ডিত। প্রাচীন ও আধুনিক মিলিয়ে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের প্রায় ১০টি ভাষায় তাঁর অসামান্য ব্যুৎপত্তি ছিল। তিনি গণিতশাস্ত্রে এতটাই পণ্ডিত ছিলেন যে, ভারতবর্ষে তিনিই প্রথম তুলনামূলক সাহিত্য এবং ধর্মদর্শনের আলোচনায় উচ্চতর গণিতের জটিল সূত্র ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সফলভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ‘দ্য পজিটিভ সায়েন্সেস অব দ্য অ্যানসিয়েন্ট হিন্দুজ’ (The Positive Sciences of the Ancient Hindus) গ্রন্থটি। তৎকালীন পাশ্চাত্য বিশ্বের ধারণা ছিল যে প্রাচীন ভারতবর্ষ কেবল ধর্ম, তন্ত্র আর আধ্যাত্মিকতা নিয়েই মেতে থাকত, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের কোনো অবদান নেই। ব্রজেন্দ্রনাথ তাঁর এই যুগান্তকারী গ্রন্থে তথ্য-প্রমাণ সহকারে দেখিয়ে দেন যে প্রাচীন হিন্দু দর্শনের গভীরে লুকিয়ে ছিল পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত ও জীববিজ্ঞানের মতো আধুনিক বিজ্ঞানের বুৎপত্তি। এই বইটিকে সমকালীন বিশ্বের বহু আন্তর্জাতিক পণ্ডিত ‘দর্শনের এনসাইক্লোপিডিয়া’ বা বিশ্বকোষ বলে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বিশ্বাস করতেন ‘সর্বজনীন মানবতাবাদ’ বা Universal Humanism-এ। ১৯১১ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত প্রথম ‘বিশ্ব জাতি কংগ্রেসে’ (Universal Races Congress) তিনি ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে যে উদ্বোধনী ভাষণ দিয়েছিলেন, তা গোটা বিশ্বের বিদ্বৎসমাজকে চমকে দিয়েছিল। তিনি বর্ণবাদ ও জাতিগত বৈষম্যের তীব্র বিরোধিতা করে বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বার্তা প্রচার করেছিলেন। ১৯৩০ সালে মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকাকালীনই তিনি পক্ষাঘাতজনিত স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে কলকাতায় ফিরে আসেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৩৮ সালের ৩ ডিসেম্বর ভবানীপুরে এই মনীষী শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজকের দিনে যখন শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও নৈতিকতার অবক্ষয় নিয়ে চারদিকে প্রশ্ন উঠছে, তখন আচার্যের মতো একজন মুক্তমনা ও উদারপন্থী মানুষের জীবন ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ৩ সেপ্টেম্বরের এই বিশেষ দিনটিতে সাড়ম্বরে তাঁর জন্মজয়ন্তী উদযাপনের পাশাপাশি তাঁর অমর সৃষ্টি ও দর্শনকে স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচিতে আরও বেশি করে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। বাঙালির বৌদ্ধিক চেতনার এই মহান ব্যক্তি ও তাঁর চিন্তাভাবনাকে তরুণ সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই হবে তাঁর প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধার্ঘ্য। স্বতন্ত্র খবর তা পালন করতে বদ্ধ পরিকর।

