"মানুষ, পৃথিবী আর সমৃদ্ধির জন্য স্বাক্ষরতা" বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস, ২০২৬ উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ
সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে যখন ভোরের প্রথম রোদ এসে ছিটকে পড়ে প্রকৃতির গায়ে, তখন মনে হয় এই পৃথিবীটা আসলে একটা মস্ত বড় খোলা বই। আমরা যারা হরফ চিনতে শিখেছি, তারা হয়তো কাগজের পাতায় কালো অক্ষরের বুনোট দেখি। কিন্তু যারা আজও সেই সুযোগ পায়নি, তারা হয়তো চেনে বনের ভাষা, নদীর গান আর আকাশের মেঘের ইশারা। এই ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক স্বাক্ষরতা দিবসে এসে যখন চারপাশের মানুষ স্লোগান দিচ্ছে—‘মানুষ, পৃথিবী আর সমৃদ্ধির জন্য স্বাক্ষরতা’, তখন কেবলই মনে পড়ছে সেইসব মানুষদের কথা, যারা প্রকৃতির কোল ঘেঁষে বেঁচে থাকে অথচ সভ্যতার বাঁধানো অক্ষরের আলো থেকে খানিকটা দূরেই রয়ে গেছে।
স্বাক্ষরতা মানে তো শুধু নাম সই করতে পারা বা খবরের কাগজের হেডলাইন পড়তে পারা নয়। স্বাক্ষরতা হলো মনের একটা জানলা, যা খুলে গেলে এক লহমায় নিজের ভেতরের মানুষটাকে চেনা যায়, চেনা যায় এই আশ্চর্য সুন্দর গ্রহটাকে, আর চেনা যায় মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার সেই আদিম ও অকৃত্রিম সমৃদ্ধিকে। হলুদ সর্ষে ক্ষেতের আল ধরে যখন একটা ছোট মেয়ে ফ্রক উড়িয়ে স্কুলের দিকে দৌড়ে যায়, তখন তার সেই ছুটে চলার মধ্যে এক অদ্ভুত আনন্দ লুকিয়ে থাকে। তার হাতে ধরা স্লেট আর চকপেন্সিল যেন এক নতুন পৃথিবীর চাবিকাঠি। মানুষের জন্য স্বাক্ষরতা মানে ঠিক এই মুক্তির স্বাদ। অক্ষর যখন কোনো মানুষের চোখের সামনে কথা বলতে শুরু করে, তখন তার মনের ভেতরের জমাট বাঁধা অন্ধকারগুলো কর্পূরের মতো উড়ে যায়। সে তখন আর শুধু পাঁচটা মানুষের মতো বেঁচে থাকে না, সে বুঝতে শেখে তার অধিকার, তার স্বপ্ন আর তার ভালোবাসার পরিধি। একটা মানুষ যখন নিজের নামটা নিজে লিখতে পারে, তখন তার বুকের ছাতিটা চওড়া হয়ে যায়। সেই আনন্দের কোনো তুলনা হয় না। ঠিক যেমন পাখিদের ডাক শুনে বনের বুক চিরে এক অপূর্ব ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি একটা নিরক্ষর মানুষের জীবনে প্রথম অক্ষরের আলো এসে পৌঁছােলে তার ভেতরটা এক অদ্ভুত মায়ায় ভরে ওঠে।
মানুষ তো আসলে একা বাঁচতে পারে না। তাকে বাঁচতে হয় অন্যের হাত ধরে, আর সেই হাতের বাঁধনটাকে আরও শক্ত আর সুন্দর করে তোলে এই শিক্ষার আলো। অথচ, এই যে আমাদের নীল-সবুজ রঙের পৃথিবীটা, যে আমাদের জন্ম থেকে আগলে রেখেছে, তাকে আমরা কত কম চিনি।পৃথিবীর জন্য স্বাক্ষরতা মানে হলো এই নীল-সবুজ থেকে ভালোবাসার পাঠ নেওয়া। আমরা যত বেশি পড়তে শিখব, যত বেশি জানতে শিখব, তত বেশি করে বুঝব যে এই অরণ্য, এই নদী, এই পাহাড় আমাদের কতটা আপন। একজন মানুষ যখন প্রকৃতির এই ভাষা পড়তে শেখে, তখন সে আর কুড়ুল হাতে গাছের দিকে এগিয়ে যায় না। সে তখন বোঝে যে একটা গাছের পাতা ঝরে যাওয়ার মধ্যেও একটা গভীর কবিতা লুকিয়ে আছে। পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে, গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের এই চোখ রাঙানি থেকে আমাদের এই চিরকালের সুন্দর গ্রহটাকে বাঁচাতে হলে পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের অক্ষরজ্ঞান থাকাটা বড্ড দরকার। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো বা জলের অপচয় বন্ধ করার জন্য বড় বড় সেমিনার করার চেয়েও অনেক বেশি জরুরি না পড়তে পারা, বসে থাকা মানুষটার হাতে একটা বই তুলে দেওয়া, যে বই তাকে শেখাবে কীভাবে এই মাটিকে ভালোবেসে বুকে টেনে নিতে হয়। যখন মানুষ আর প্রকৃতি এক হয়ে যায়, তখন পৃথিবীর বুক থেকে সব অসুখ এক নিমেষে সেরে যায়।
সমৃদ্ধি শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে একরাশ টাকা-পয়সা, বড় গাড়ি আর বহুতল বাড়ির ছবি। কিন্তু আসল সমৃদ্ধি তো লুকিয়ে থাকে মানুষের মনে আর তার চিন্তাভাবনায়। স্বাক্ষরতা হলো সেই সমৃদ্ধির আসল ভিত্তিপ্রস্তর। একটা সমাজ তখনই সত্যি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে, যখন তার প্রতিটি কোণ থেকে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর হয়ে যায়। শিক্ষার আলো যখন ঘরের মধ্যে এসে পৌঁছায়, তখন দারিদ্র্য আর কুসংস্কার জানলা দিয়ে পালিয়ে যায়। মাটির ঘর থেকেও তখন স্বপ্নেরা ডানা মেলতে শুরু করে। একজন স্বাক্ষর মা যখন তার সন্তানকে কোলের কাছে বসিয়ে রূপকথার গল্প পড়ে শোনায়, তখন সেই ঘরের কোণে যে সমৃদ্ধির জন্ম হয়, তা পৃথিবীর কোনো ধনকুবেরের সিন্দুকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই সমৃদ্ধি হলো আত্মবিশ্বাসের, সেই সমৃদ্ধি হলো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আকাশ ছোঁয়ার চেষ্টার। জীবনটাকে শুধু কাটিয়ে দেওয়া নয়, জীবনটাকে উপভোগ করার নামই সমৃদ্ধি। আর সেই উপভোগের রাস্তাটা তৈরি করে দেয় বইয়ের পাতা, অক্ষরের জাদু।
সন্ধেবেলা যখন পাহাড়ের মাথায় সূর্যটা টুপ করে ডুবে যায়, আর শালবনের ওপর দিয়ে এক ফালি চাঁদ ভেসে ওঠে, তখন মনে হয়, এই পৃথিবীতে কত কিছু জানার বাকি রয়ে গেল, কত কিছু চেনার বাকি রয়ে গেল। শিক্ষার আলো যার জীবনে পৌঁছােয়নি, তার কাছে এই পৃথিবীটা যেন একটা বন্ধ দরজার মতো। সেই দরজার ওপাশে কত আলো, কত গান, কত রূপকথা লুকিয়ে আছে, সে তা জানতেই পারল না। তাই তো আজ আমাদের সবাইকে একজোট হতে হবে। কোনো ভেদাভেদ নয়, কোনো রাজনীতি নয়, শুধু এক বুক ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে সেইসব মানুষের দিকে, যারা আজও অক্ষরের স্পর্শ পায়নি। একটা মানুষকে একটা অক্ষর শেখানো মানে তাকে একটা নতুন জীবন উপহার দেওয়া। তার সেই প্রথম পড়তে পারার হাসির মধ্যে যে স্বর্গীয় আনন্দ লুকিয়ে থাকে, তা দেখলে মনটা এক নিমেষেই ভালো হয়ে যায়।
আসুন না, আমরা সবাই মিলে এই পৃথিবীর বুক থেকে নিরক্ষরতার এই শেষ দাগটুকুও মুছে ফেলি। আলোয় যখন কোনো মানুষ প্রথম কোনো বইয়ের পাতা উল্টােয়, তখন তার সেই মুখে এক নতুন আশার আলো ঝিলিক দিয়ে ওঠে। সেই আলোটাই আমাদের আসল সম্পদ। মানুষ বাঁচবে তার আপন গরিমায়, পৃথিবী হাসবে তার চিরন্তন সবুজে, আর সমৃদ্ধি আসবে প্রতিটা মানুষের ঘরে ঘরে। শিক্ষার এই সহজ পাঠটাই তো আমাদের জীবনকে সুন্দর করে তোলে। বনের পাখিরা যেমন কোনো ইশারা ছাড়াই গান গেয়ে ওঠে, হাওয়ার দোলায় যেমন গাছের পাতাগুলো নেচে ওঠে, ঠিক তেমনি আমাদের জীবনটাও অক্ষরের আলোয় নেচে উঠুক, মেতে উঠুক এক মহা উৎসবে। তবেই তো সার্থক হবে এই পৃথিবী, আর তবেই তো সার্থক হবে আমাদের এই মানুষ হয়ে জন্মানো।

