বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
অবকাশ

শ্যামল সুন্দরে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা 

প্রকাশিত: ৬ আগস্ট, ২০২৬
শ্যামল সুন্দরে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা 
দীপ্র ভট্টাচার্যদীপ্র ভট্টাচার্য
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

উত্তরবঙ্গের বর্ষার একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। সে গন্ধ মাটির নয়, কেবল ভেজা পাতারও নয়—সে গন্ধ যেন বহুদিন ধরে চুপ করে থাকা পাহাড়ের দীর্ঘশ্বাস। সেই দীর্ঘশ্বাসে মিশে থাকে নদীর কলকল, চা-বাগানের নরম সবুজ, আর মেঘের অনন্ত যাত্রা।

ওদলাবাড়ি পেরিয়ে মানাবাড়ির দিকে যেতে যেতে হঠাৎ মনে হচ্ছিল, সভ্যতার সমস্ত কোলাহল যেন কোথাও পেছনে পড়ে রইল। রাস্তার দু'পাশে সবুজের যে সমুদ্র, তার কোনো শেষ নেই। বৃষ্টি কখনও ঝিরঝির করে নামে, কখনও অঝোরে। আবার আচমকা সূর্যের আলো এসে ভেজা পাতায় রুপোলি আগুন ধরিয়ে দেয়। এমন আলো-আঁধারের খেলায় পথও যেন নিজের ভাষা ভুলে যায়।

সেই পথের একেবারে শেষ প্রান্তে, ঘিস নদীর ধারে, যেন প্রকৃতি নিজের হাতে একটি নির্জন বারান্দা বানিয়ে রেখেছে। সেখানে দাঁড়ালে মনে হয়, মানুষ আসলে অতিথি। ঘরবাড়ি, আসবাব, বিলাস—সবই ক্ষণিকের। স্থায়ী কেবল নদী, পাহাড় আর আকাশ।

শ্যামল সুন্দরে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা 6

সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথম যে শব্দটি কানে আসছিল, তা মানুষের নয়। ঘিস নদীর জল পাথরে আঘাত করে একটানা যে সুর তোলে, তার মধ্যে অদ্ভুত এক শান্তি আছে। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত ব্যস্ততা থেকে দূরে কোথাও এক আদিম সময় এখনও বেঁচে আছে। বারান্দার দরজা খুলতেই চোখের সামনে কোনো পাঁচিল নেই, কোনো কংক্রিট নেই। কেবল নদী, তার ওপারে সবুজ পাহাড়, আর পাহাড়ের কাঁধে ঘুমিয়ে থাকা মেঘ।

এই 'না-থাকা'ই বোধহয় সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। চোখের সামনে কিছু না থাকলেই প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ দেখা যায়। শহরে আমরা আকাশ দেখি জানলার ফাঁক দিয়ে। এখানে আকাশ নিজেই এসে বসে ছিল আমার সামনে।

বর্ষার বৃষ্টি এখানে কেবল আবহাওয়া নয়, যেন এক চরিত্র। কখনও সে দুরন্ত বাচ্চার মতো ছুটে আসে, কখনও আবার নিঃশব্দে এসে সঙ্গীর মত পাহাড়কে জড়িয়ে ধরে। নদীর বুকের ওপর যখন অসংখ্য বৃষ্টির ফোঁটা একসঙ্গে নাচছিল, তখন মনে হচ্ছিল যেন কেউ অদৃশ্য হাতে রূপোর সুতো বুনছে। সেই দৃশ্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে দেখা যায়। সময়ের কোনো তাড়া থাকে না।

শ্যামল সুন্দরে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা

মাঝে মাঝে নদীর ধারে নেমে যাওয়া যায়। ছড়ানো ছেটানো, ধারালো পাথরের ফাঁক দিয়ে জল বয়ে চলেছে। কোথাও হাঁটুজল, কোথাও একটু গভীর। জুতো খুলে জলে পা রাখতেই হিমশীতল স্রোত শরীরের ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একটা সখ্যতা ও তৈরী হয়ে যায়। নদীর স্পর্শে তখন আর কোনো রোমাঞ্চ নয়, বরং মনে হয় নদী যেন একটু ছুঁয়ে দেখতে চাইছে—আমি সত্যিই এসেছি কি না।

এই নদী কথা বলে না। অথচ কত কথা শোনায়! জলের শব্দের মধ্যে কখনও ছোটবেলার বিকেল ফিরে আসে, কখনও বহুদিন আগের কোনো মুখ। প্রকৃতির সবচেয়ে বড় আশ্চর্য এই যে, সে কখনও স্মৃতি তৈরি করে না; সে কেবল ঘুমিয়ে থাকা স্মৃতিগুলোকে জাগিয়ে তোলে।

বিকেলের দিকে পাহাড়ের রং বদলাতে শুরু করে। দুপুরের গাঢ় সবুজ আস্তে-আস্তে ধূসর হয়ে আসে। তারপরে কোথা থেকে যেন মেঘ নেমে আসে। এক মুহূর্তে পাহাড়গুলো অদৃশ্য। আবার পাঁচ মিনিট পরেই মেঘ সরে গেলে নতুন এক পাহাড়ের জন্ম হয়। যেন প্রকৃতি নিজেই নিজের ছবি বারবার আঁকছে, আবার মুছেও দিচ্ছে।

সন্ধে নামারও নিজস্ব ভঙ্গি আছে এখানে। আলো নিভে যায় না, বরং সবুজের ভেতরে মিশে যায়। নদীর শব্দ তখন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দূরের পাহাড় কালো ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো নেই। মানুষের বানানো সময় যেন এখানে এসে থেমে যায়। আর এই থেমে যাওয়াটাই বোধহয় আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিলাসিতা।

রাতে বারান্দায় বসে থাকলে বৃষ্টির গন্ধের সঙ্গে পাহাড়ি বাতাস এসে মিশে যায়। আকাশে তারা থাকুক বা না থাকুক, অন্ধকারেরও এক অদ্ভুত দীপ্তি আছে। মনে হয়, এতদিন ধরে আমি আলো খুঁজেছি ভুল জায়গায়। প্রকৃতির অন্ধকারও যে এত আলোকময় হতে পারে, তা শহরে বসে বোঝা যায় না।

শ্যামল সুন্দরে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা 1

এমন রাতের শেষে ভোরও আসে খুব ধীরে। কোনো ঘোষণা ছাড়া। প্রথমে শুধু নদীর রং বদলায়। তারপর পাহাড়ের মাথায় একফালি আলো। মেঘের গায়ে হালকা গোলাপি আভা। দূরে কোথাও অচেনা পাখির ডাক। মনে হয় পৃথিবীর প্রথম সকালও বুঝি এমনই ছিল।

সেই ভোরে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হয়, মানুষ যত দূরেই যাক, যত বড়ই হোক, তার ভেতরে কোথাও এক বনভূমি থেকে যায়। সেই বনভূমিতে এখনও নদী বয়ে যায়, বৃষ্টি নামে, মেঘ ভাসে। আর জীবনের সমস্ত ক্লান্তি শেষে মন বারবার ফিরে যেতে চায় ঠিক এমন এক নদীর ধারে—যেখানে চোখের সামনে কোনো বাধা নেই, কেবল অনন্ত সবুজ, বহমান খরস্রোতা জল আর আকাশের নীল নীরবতা।

নারীর সৌন্দর্যের মত প্রকৃতিও কখনও তার সমস্ত রূপ একদিনে দেখায় না। মানুষের মতোই তারও বিশ্বাস জন্মাতে সময় লাগে। প্রথম দিন সে দূর থেকে দেখে, দ্বিতীয় দিন একটু কাছে ডাকে, আর তৃতীয় দিনের সকালে হঠাৎ বুঝতে পারি—সে আমাকে তার নীরবতার ভেতরে বসতে দিয়েছে। এই তিন রাত, চার দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কোনো ভ্রমণ নয়; বরং নিজেকে একটু ফিরে পাওয়া।

রিসর্টের অন্য দিকটায় ছিল বিস্তীর্ণ চা-বাগান। যতদূর চোখ যায়, সবুজের পর সবুজ, যেন পৃথিবীকে কেউ অগণিত কোমল তুলির টানে এঁকে রেখেছে। ভোরের শিশিরে চা-পাতার ডগায় সূর্যের প্রথম আলো এসে যখন থেমে থাকছিল, মনে হচ্ছিল,যেন প্রতিটি পাতা যেন আলাদা করে আশীর্বাদ পেয়েছে।

শ্যামল সুন্দরে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা 2

চা বাগানে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ কোথা থেকে একজোড়া ময়ূর বেরিয়ে আসে। মানুষের উপস্থিতিতে তারা ভয় পায়, তবু পালায় না। ধীর পায়ে হাঁটে। কখনও ঘাড় উঁচু করে তাকায়, কখনও আবার সবুজের ভেতরে মিলিয়ে যায়। তাদের দেখে মনে হয়, সৌন্দর্য কখনও নিজের পরিচয় দেয় না; সে শুধু এক ঝলক দেখা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

স্থানীয় এক ড্রাইভার-গাইড বলছিলেন, এই সবুজের গভীরে চিতাবাঘও আছে। চা বাগানের খাঁড়ির ফাঁকে বাচ্চা হবার সময় এসে থাকে। খুব কম মানুষই তাকে দেখতে পায়। সে নাকি মানুষকে অনেক আগেই দেখে ফেলে, কিন্তু নিজেকে দেখায় না।

অদ্ভুত কথা। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলিও কি এমনই নয়? ভালোবাসা, শান্তি, বিশ্বাস—তারা কোথাও থাকে। কিন্তু তাদের দেখা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়।

সেদিন বিকেলে বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর নদীর দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ বসেছিলাম। আকাশে তখন সূর্য ডুবছে। পাহাড়ের গায়ে কমলা, সোনালি আর সবুজ মিশে এমন এক রং তৈরি হয়েছে, যার কোনো নাম জানা নেই। নদীর জলে, সেই রং ভেঙে ভেঙে পড়ছে। স্রোত তাকে ধরে রাখতে পারছে না, আবার হারিয়েও ফেলছে না। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল—প্রকৃতি যেন কোনো দৃশ্য নয়, প্রকৃতি এক চলমান প্রার্থনা।

শ্যামল সুন্দরে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা 3

আমরা শহরের মানুষ কত অদ্ভুত! সুখকে ধরে রাখতে চাই, সময়কে আটকে রাখতে চাই, সম্পর্ককে বেঁধে রাখতে চাই। অথচ নদী শেখায়, যা সুন্দর, তাকে বয়ে যেতে দিতে হয়। পাহাড় শেখায়, স্থির থাকা মানেই থেমে যাওয়া নয়। আর মেঘ শেখায়, ফিরে আসার জন্য অবশ্যই হারিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

বর্ষার দুপুরগুলোরও এক অদ্ভুত মাদকতা আছে। কখনও চারদিক এত ঘন মেঘে ঢেকে যায় যে মনে হচ্ছিল পৃথিবী থেকে যেন সমস্ত রং মুছে গেছে। তারপর আচমকা বাতাস ওঠে। মেঘ সরে যায়। দূরের পাহাড় আবার দেখা দেয়। যেন কেউ পর্দা সরিয়ে দিয়েছে। জীবনও কি ঠিক এমনই নয়? সবচেয়ে দীর্ঘ অন্ধকারেরও কোথাও না কোথাও একটি সরে যাওয়ার মুহূর্ত অপেক্ষা করে থাকে।

শেষ দিনের ভোরে ঘুম তাড়াতাড়ি ভেঙে যেতে, উঠে বারান্দায় বসেছিলাম। আমাদের ঘিস নদী তখনও রাতের স্বপ্ন বয়ে নিয়ে চলেছে। আস্তে -আস্তে আলো বাড়ছে। কুয়াশা সরছে। পাহাড়ের গা থেকে যেন সাদা শাল খুলে নেওয়া হচ্ছে। সেই দৃশ্য দেখে হঠাৎ মনে হল, সূর্য কখনও পৃথিবীকে জাগায় না; জাগিয়ে তোলে অপেক্ষাকে।

আমাদের জীবনেরও কত অপেক্ষা! একটু শান্তি, একটু অবসর, একটু নিজের সঙ্গে কথা বলার সময়। অথচ আমরা সারা জীবন সেই অপেক্ষাকেই পিছিয়ে দিই। এই কয়েকটা দিনে মোবাইলের স্ক্রিনের চেয়ে অনেক বেশি দেখেছি নদীর জল। নোটিফিকেশনের শব্দের বদলে শুনেছি স্রোতের ডাক। মানুষের ভিড়ের বদলে দেখেছি মেঘের আসা-যাওয়া। আর আশ্চর্যভাবে বুঝেছি, পৃথিবীকে জানার আগে প্রকৃতির কাছে চুপ করে বসতে শেখা দরকার।

শ্যামল সুন্দরে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা 4

সব ভ্রমণ নতুন জায়গায় নিয়ে যায় না; কিছু ভ্রমণ আমাদের নিজের কাছেই ফিরিয়ে আনে। ফেরার দিন ইনোভা গাড়িটা যখন ধীরে ধীরে মানাবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এল, তখন মনে হচ্ছিল, কিছু একটা ফেলে যাচ্ছি। অথচ ব্যাগে সবই আছে।জামাকাপড়, মোবাইল, স্মৃতি—সব। শুধু ফেলে যাচ্ছি একটুকরো মন।

গাড়ির পেছনের কাচ দিয়ে শেষবারের মতো দেখলাম ঘিস নদী বয়ে চলেছে। তার কোনো তাড়া নেই। সে জানে, মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়। কিন্তু নদী অপেক্ষা করতে জানে।

হয়তো কোনো এক বর্ষায় আবার ফিরব। হয়তো আবার সেই বারান্দায় বসব। আবার দেখব, মেঘ কীভাবে পাহাড়ের কানে কানে গোপন কথা বলে। বৃষ্টি কীভাবে নদীর বুক জুড়ে অগণিত বৃত্ত এঁকে হারিয়ে যায়। সন্ধে কীভাবে সবুজকে ধীরে ধীরে নীল করে দেয়। আর তখনও হয়তো মনে হবে— পৃথিবীতে কিছু কিছু জায়গা থাকে, যেখানে বেড়াতে যাওয়া যায় না; সেখানে কেবল ফিরে যাওয়া যায়।

শ্যামল সুন্দরে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা 5

এই পৃথিবীতে মানুষের তৈরি অবাকের অভাব নেই। আকাশ ছোঁয়া বাড়ি আছে, কাঁচের শহর আছে, আলোয় মোড়া রাস্তা আছে। তবু সব কিছুর শেষে মন খুঁজে ফেরে এমন এক নদীকে, যে নিজের পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করে না; এমন এক পাহাড়কে, যে নিজের। বিস্তৃতির কথা বলে না; এমন এক বর্ষাকে, যে কেবল নদীর জলকে ভিজিয়ে দিয়ে চলে যায়।

সম্ভবত এই কারণেই প্রকৃতি কখনও পুরোনো হয় না। সে প্রতিদিন একই থাকে, অথচ প্রতিদিন নতুন। আর মানুষ? সে প্রতিবার ফিরে এসে নতুন করে বুঝতে শেখে—পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য চোখে দেখা যায় না; তা ধরা পড়ে মন কেমন করা এক নীরবতার ভিতরে।

আরও অবকাশ খবর