জীবনযাপন
নীরব ঘাতক হাইপারটেনশন: কীভাবে বাঁচবেন
প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি: বর্তমানের দ্রুতগতির জীবনে এক অদৃশ্য মহামারি থাবা বসাচ্ছে প্রতিটি ঘরে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘হাইপারটেনশন’ বা উচ্চ রক্তচাপ। এটি এমন এক শারীরিক পরিস্থিতি, যেখানে ধমনীর দেওয়ালে রক্তপ্রবাহের চাপ ক্রমাগত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই বেশি থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গাইডলাইন অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তির রক্তচাপের পরিমাপ ১৪০/৯০ mmHg বা তার বেশি হয়, তবে তাকে হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চিকিৎসকদের পরিভাষায় এটি একটি ‘নীরব ঘাতক’ (Silent Killer), কারণ প্রাথমিক অবস্থায় এর কোনো স্পষ্ট উপসর্গ বা লক্ষণ বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
উচ্চ রক্তচাপ মূলত দু’টি কারণে হতে পারে— প্রাইমারি বা এসেনশিয়াল হাইপারটেনশন এবং সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন। এর পেছনে থাকা মূল কারণগুলি হল বংশগত বা জিনগত ধারা। পরিবারে বাবা-মা বা অন্য কারও এই সমস্যা থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ জীবনশৈলী। অতিরিক্ত নুন বা সোডিয়াম যুক্ত খাবার খাওয়া, ফাস্টফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি আসক্তি রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও ওবেসিটিও এর অন্যতম বড় কারণ। নিয়মিত শরীরচর্চা না করা এবং ওজন অতিরিক্ত বেড়ে গেলে হৃদযন্ত্রের উপর রক্ত পাম্প করার বাড়তি চাপ পড়ে। ধূমপান ও মদ্যপানের ফলে তামাক ও মদের মধ্যে থাকা রাসায়নিক উপাদান ধমনীর দেওয়ালকে শক্ত ও সঙ্কুচিত করে তোলে, যা রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। অত্যধিক মানসিক চাপ ও অনিদ্রার কারণে কর্মক্ষেত্রের ব্যস্ততা বা ব্যক্তিগত জীবনের দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব রক্তচাপের পারদ চড়াতে সাহায্য করে। এ ছাড়া কিডনির অসুখ, থাইরয়েডের সমস্যা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো আন্ডারলাইং মেডিকেল কন্ডিশনের কারণেও সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন দেখা দিতে পারে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগটি আড়ালে থাকলেও, রক্তচাপ অতিরিক্ত বাড়লে কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন ঘন ঘন তীব্র মাথা ব্যথা (বিশেষ করে সকালের দিকে), মাথা ঘোরা, ঝাপসা দৃষ্টি বা চোখের সমস্যা। অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্তি বোধ করা এবং বুকে অস্বস্তি বা ধড়ফড়ানি হওয়া। মাঝেমধ্যেই নাক দিয়ে রক্ত পড়া এবং শ্বাসকষ্ট হওয়াও এর অন্যতম লক্ষণ।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তন আনলেই এই মারণ রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। দৈনিক খাদ্যতালিকায় আলগা নুন খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং সোডিয়ামের পরিমাণ কমাতে হবে। খাবারে পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম সমৃদ্ধ সবুজ শাকসবজি, ফল এবং দানাশস্যের পরিমাণ বাড়াতে হবে। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হালকা ব্যায়াম, হাঁটা, সাঁতার কাটা বা যোগব্যায়াম করা জরুরি। ৪০ বছর বয়স পেরোলে বা পরিবারে ইতিহাস থাকলে মাসে অন্তত একবার রক্তচাপ পরীক্ষা করানো উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শমতো নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে।

