সাহিত্য সংস্কৃতি
'টঙ্গাবতী থেকে ভাগীরথী': ছিন্নমূল মানুষের নিদারুণ যন্ত্রণার দলিল _লালমিয়া মোল্লা
প্রকাশিত: ৭ আগস্ট, ২০২৬
রুদ্ধশ্বাস এবং তীব্র পিপাসা নিয়ে পড়া শেষ করলাম সলিল বিশ্বাস-এর লেখা উপন্যাস 'টঙ্গাবতী থেকে ভাগীরথী'। ব্রিটিশ-ভারত, দেশ ভাগ, পূর্ব পাকিস্তানের পাক-অন্তর্ভূক্তি, পূর্ব পাকিস্তানের অস্তিত্বের সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশ সৃষ্টি, সংখ্যালঘুর অস্তিত্বের সংকট, ছিন্নমূল মানুষের ভারতে অনুপ্রবেশ ও তৎপরবর্তী জীবনসংগ্রামের এই সমগ্র জার্নিই হল এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। ইতিহাস আশ্রয়ী এই উপন্যাসটি এক অদ্ভুত মুন্সিয়ানায় লেখক দুটি খণ্ডে পাঠকের দরবারে হাজির করেছেন। পড়লেই বোঝা যায় কী অপরিসীম পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে এ কাজ তিনি সম্পন্ন করেছেন।
আট বছরের বালক আরাকান রাজা চন্দ্র সুধর্মার শাসনকাল থেকে এই উপন্যাসের সূচনা। এভাবে মোঘল শাসন, পর্তুগিজ ও মগ দস্যুদের আক্রমণ, গৌড়ীয় শাসন, চট্টগ্রামে নতুন জনপদ সৃষ্টি ইত্যাদি ইতিহাসের ক্রমপর্যায়ের ভিতর দিয়ে এই উপন্যাসের অগ্রসৃতি।
এভাবেই এক জায়গায় তিনি লিখছেন, "নবাব বাদশাদের পৃষ্ঠপোষকতায় উচ্চবর্ণের হিন্দুরাও বিকশিত হচ্ছিল সমান্তরাল। রাজ্য পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হতো তারাও। বিশেষ করে রাজস্ব ও দেওয়ানী বিভাগ ন্যস্ত থাকত তাদের উপর। বুদ্ধিমত্তা এবং কর্ম কুশলতায় সন্তুষ্ট মুসলিম শাসকরা নানা খেতাব-উপাধি দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করতেন তাদের।"
আসলে যুগে-যুগে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করেছে রাজনীতির কারবারীরা। সাধারণ মানুষ নয়। এ-কথা আজকের সময়ে আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে এই উপন্যাসের নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি উল্লেখযোগ্য।
সলিলবাবু লিখছেন, "একসঙ্গে থাকা আড্ডা মেলামেশায় আবাসিক সহপাঠীদের মধ্যে নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। গণি, হাকিম, মঞ্জুরকে নিমন্ত্রণ করে রণধীর ঘরে নিয়ে গেল একদিন। নুরুল বাড়ি যাওয়ায় আসতে পারেনি। ছেলের বন্ধুদের দেখে খুশি কুসুমকুমারী রক্ষণশীলতা বা পরশ দোষ উপেক্ষা করে ওদের মুরগির মাংস রান্না করে খাওয়ায়। বাৎসল্যে ভেঙে যায় ধর্মের বেড়া।"
আবার যখন পাকিস্তানের মদতপুষ্ট বাহিনীর অত্যাচারে ঘর ছাড়তে হচ্ছে— তখন নীলমণি মাকে বলল, "আমরা আপাতত পূর্বের মগপাড়ায় গিয়ে আশ্রয় নেব। তোমরা এই বয়সে হাঁটাহাঁটি করতে পারবে না পাহাড় জঙ্গলে। ঘরে থাকো, বয়স্ক বলে তোমাদের ঝুঁকি কম। দেখাশোনার জন্য শ্যামল থাকছে। ছোট বলে তার ওপর নজর পড়বে না কারো। ভাতেরও অভাব হবেনা। ভাগচাষী কালামিঞা বলেছে প্রয়োজনে ধান দিয়ে সাহায্য করবে।"
এভাবেই একদিন এসেছে দেশভাগের সেই সর্বনাশা কাহিনি। সুচতুর ইংরেজ ভারতকে দু-ভাগ করে দিয়ে দুটি দেশকে দুর্বল ও একে অপরের চিরশত্রু বানিয়ে দিয়ে গেল। জিন্নাহ্ বেছে নিলেন পাকিস্তান। বাংলার পূর্বাংশ পূর্ব পাকিস্তান নাম নিয়ে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হল। নিজের ঘরের ভিতরেই চির দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ পাক কর্তৃপক্ষ পূর্ব পাকিস্তানকে শাসনে রাখার জন্য তাদের মাতৃভাষা বাংলা পরিবর্তন করে উর্দু করতে চাইলো। অবধারিতভাবে শুরু হল ভাষা আন্দোলন। টঙ্গাবতী নদীর স্রোতে তারপর অনেক জল গড়াল। এভাবেই ইতিহাসের হাত ধরে একদিন শুরু হল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। ভারতের সহযোগিতায় মুজিবরের নেতৃত্বে এই যুদ্ধে গঠিত হল স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মুক্তি মিলল না। পাকিস্তান চুপ থাকল না। বাংলাদেশে লুকিয়ে থাকা তাদের চরেরা গোপনে প্ররোচনা দিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করল স্বাধীন বাংলাদেশের ভিতরে। বারে বারে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা পরিবর্তিত হতে থাকলো শাসকের পর শাসকের রক্ত ঝরিয়ে। সংখ্যালঘুদের উপর চলল বর্বর আক্রমণ। তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠল বাংলাদেশে। প্রাণ মান বাঁচাতে তারা দেশ ছাড়তে শুরু করল। ছিন্নমূল ক্ষুধাতুর মানুষের নদী-অরণ্য-পর্বতসঙ্কুল পথে সেই অবর্ণনীয় যাত্রা এই উপন্যাসে বিবৃত হয়েছে। ক্লান্ত অবসন্ন মা পিচ্ছিল পাথর-পথে পাহাড় ডিঙোতে পারবে না বলে সন্তানকে নামিয়ে রেখে চলে যায়। আর এক মা তীব্র গরমে ও অপরিশোধিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়া সন্তান কাঁধে নিয়ে হাঁটলেও যথাযথ চিকিৎসার অভাবে কোলেই সেই সন্তানকে হারায়।
প্রতিটি ছিন্নমূল মানুষই এই উপন্যাসের নায়ক। তবুও শেষ পর্বে তাদের প্রতিনিধি হিসাবে আমরা পাই চট্টগ্রাম জেলার সুখছড়ির মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান রণধীরকে। তার জীবন সংগ্রামের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু মানুষের প্রকৃত অবস্থা আমরা অনুধাবন করতে পারি। নিজের দেশে টিকে থাকার সব রকম চেষ্টা বিফল হবার পর সবশেষে বাধ্য হয়ে সেও একদিন দেশ ছাড়ে। ফেলে আসে আত্মীয়-পরিজন, আজন্মের গ্রাম সুখছড়ি, দেশের মাটি আর প্রেম।
পড়তে পড়তে একজন পাঠক হিসেবে অতীতের সুখছড়ি ও সংলগ্ন অঞ্চলে যেন আমারই নিজের ছোটবেলাকার মাঠ ঘাট পুকুরপাড় ও মানুষজনদের খুঁজে পাই। লেখকের চমৎকার বর্ণনায় সব যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। কবিতার মত তার কথন অংশ।
প্রথমবার দেশ ছেড়ে আসার সময় তিনি লিখছেন, "পথের চলা শুরু। কুসুম কুমারীরা পশ্চিমে গৃহগামী। নীলমণিরা পূর্বে অনন্ত সফরে। অজানা গন্তব্যের সন্ধানে হেঁটে যাওয়া। ঊষার অন্ধকার মেখে ঘন কাজল বন। উঁচু-নীচু, এবড়ো-খেবড়ো আঁকাবাঁকা উপজাতিদের পায়ে চলা চিহ্ন খুঁজে হাঁটা। দুপাশে বুনো জঙ্গল। গাছ-লতা-গুল্মের আবেষ্টন। হাঁটতে-হাঁটতে ফিকে হতে থাকে অন্ধকারের ঘনত্ব। পূর্বের আকাশে ফুটে ওঠে আলোর আভাস। দেখতে-দেখতে সূর্যের প্রথম কিরণ ছড়িয়ে পড়ল অরণ্যানীর শিশির ভেজা সবুজ পাতায়। রাত্রির ধ্যান ভেঙে জেগে উঠল অটবি। ডালে-বৃন্তে পাখিদের দোল, উড়াউড়ি। তাদের কলতানে মৌনতা ভেঙে মুখরিত সবে নিদ্রা উত্থিত অরণ্য। প্রাতঃ হাওয়ার স্নিগ্ধতায় ফুল্ল বন-কুসুম-দল। পাপড়ি মেলে পরাগ মিলনে আহ্বান জানাতে থাকে ভ্রমর-প্রজাপতিকে। উদ্বেগ ভারাক্রান্ত পলাতকদের কাছে প্রকৃতির এই লিখেছে লীলাময়তা যেন ব্যঙ্গ। বিপন্ন পথিকের কাছে রূঢ় গদ্য নিঃসর্গের এই কাব্যময়তা।
উপন্যাস: টঙ্গাবতী থেকে ভাগীরথী
লেখক- সলিল বিশ্বাস
প্রকাশক: বই-ভব পাবলিশার্স
মুদ্রিত মূল্য:২৫০/- প্রতি খন্ড

