অফবিট
নকুলদানার ইতিবৃত্ত, যা মুগ্ধ করবে আপনাকে
প্রকাশিত: ১১ জুন, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদনঃ নকুলদানা হলো চিনি দিয়ে তৈরি ছোট, গোলাকার এবং শক্ত এক ধরণের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি, যা প্রধানত হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে এবং পূজার প্রসাদ হিসেবে ভারত ও নেপালে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
কবে বা ঠিক কোন দিনটিতে নকুলদানার জন্ম হয়েছিল, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তারিখ বা নথিবদ্ধ প্রমাণ নেই। তবে লোকগাথা, পৌরাণিক সংযোগ এবং প্রাচীন ধর্মীয় সাহিত্যের উপাদান থেকে এর ইতিহাস ও উৎপত্তির একটি বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়।
নামকরণের ইতিহাস ও পৌরাণিক বিশ্বাস
নকুলদানা নামের উৎপত্তি নিয়ে মূলত তিনটি প্রধান মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। লোককথা অনুযায়ী, মহাভারতের পঞ্চপাণ্ডবের চতুর্থ ভাই নকুল খাবার নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে ভালোবাসতেন। একদিন তিনি খই বা মটরদানাকে ঘন চিনির রসে ডুবিয়ে একটি নতুন মিষ্টি তৈরি করেন। তাঁর নামানুসারেই এই মিষ্টির নাম হয় 'নকুলদানা'। অন্য মতে সংস্কৃতে 'নকুল' শব্দের একটি অর্থ হলো 'খুব সুন্দর'। আবার দেবদেবীদের মধ্যে মহাদেব বা শিবের অপর নামও নকুল। শিবের নৈবেদ্য বা সুন্দর দেখতে ছোট দানা হওয়ার কারণে এর নাম নকুলদানা হয়ে থাকতে পারে।
বৈষ্ণব সংস্কৃতি ও প্রাচীন সাহিত্যে উল্লেখ
নকুলদানার ইতিহাস বাংলার বৈষ্ণব সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটিকে আদতে একটি 'বৈষ্ণব মিষ্টি' হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রাচীন বৈষ্ণব পদাবলী এবং চৈতন্য চরিতামৃতের বিভিন্ন জায়গায় কাঁসার বাটিতে বা রেকাবিতে নকুলদানা পরিবেশন করার ও আচারের উল্লেখ পাওয়া যায়।
ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথধামে প্রভুর ঘুম ভাঙার পর 'বাল্যভোগ' বা সকালের পূজায় নকুলদানা ও বাতাসা দেওয়ার প্রথা বহু প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে, যা আজও অপরিবর্তিত। এমনকি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শুভদৃষ্টি' গল্পেও কাঁসার রেকাবিতে করে বিয়ের সম্বন্ধের আচারে নকুলদানা পরিবেশনের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বলা হয়ে থাকে, প্রাতিষ্ঠানিক বা বাণিজ্যিকভাবে এই ধরণের চিনির বলের একটি ঐতিহাসিক সূত্রপাত পাওয়া যায় নেপালে। ১৮৬০-এর দশকে নেপালের পাল্পা (Palpa) এলাকার ভৈরবস্থান মন্দিরে (Bhairavsthan Temple) প্রথম এই ছোট মটর দানার আকৃতির চিনির মিষ্টি তৈরি ও প্রসাদ হিসেবে বিতরণ শুরু হয়। পরবর্তীতে এটি সমগ্র ভারত, বিশেষ করে পূর্ব ভারতে (পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা) ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
কেন এত জনপ্রিয়তা? প্রাচীনকালে মিষ্টি বলতে ছানার তৈরি সন্দেশ বা রসগোল্লাকে বোঝাত, যা দ্রুত নষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু নকুলদানা সম্পূর্ণ চিনির তৈরি হওয়ায় এবং এতে কোনো জলীয় অংশ না থাকায় এটি এয়ারটাইট পাত্রে রাখলে বহু মাস পর্যন্ত ভালো থাকে। দূর-দূরান্তে সহজে বহন করা এবং নষ্ট না হওয়ার এই গুণের কারণেই এটি মন্দিরে মন্দিরে প্রধান 'যাত্রী-প্রসাদ' বা নিত্যপূজার অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।
বর্তমানে সনাতন পদ্ধতিতে চিনির রস কড়াইতে ফুটিয়ে তাতে সোডা মিশিয়ে খই বা মটরদানার ওপর অনবরত নেড়ে এটি তৈরি করা হয়। তবে বড় স্কেলে কারখানায় এখন ঘূর্ণায়মান মিক্সিং মেশিনের সাহায্যে চিনি থেকে এই গোলাকার দানা তৈরি হয়।
আমাদের এই অতি পরিচিত নকুলদানার একটি চমৎকার ইংরেজি নামও রয়েছে। একে ইংরেজিতে বলা হয় 'মিমোসা শুগার বল' (Mimosa Sugar Balls)। 'মিমোসা' নামের একটি বিশেষ ফুল রয়েছে, যা দেখতে ছোট ছোট সাদা বলের মতো। সেই ফুলের আকৃতির সাথে মিল রেখেই আন্তর্জাতিকভাবে একে এই নামকরণ করা হয়েছে।

