বিপ্লবের বহ্নিশিখা দেশপ্রেমিক উল্লাসকর দত্ত
বিশেষ প্রতিবেদন: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সশস্ত্র বিপ্লবের যে অধ্যায়, তা যেমন রক্তঝরা, তেমনই রোমাঞ্চকর। সেই অধ্যায়ের এক অবিস্মরণীয় এবং উজ্জ্বল নক্ষত্র বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত। ফাঁসির দড়িকে যিনি হাসিমুখে বরণ করতে চেয়েছিলেন এবং আন্দামানের সেলুলার জেলের অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেও দেশের প্রতি ভালোবাসায় অবিচল ছিলেন, তিনি উল্লাসকর। অথচ আজ স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের পাতায় তাঁর বীরত্বগাথা যেন অনেকটাই ম্লান। সহজ-সরল জীবনের অধিকারী এই নির্ভীক বাঙালি বিপ্লবীর জীবনকাহিনি আজও প্রতিটি ভারতবাসীকে উদ্বুদ্ধ করে।
১৮৮৫ সালের ১৬ এপ্রিল অবিভক্ত বাংলার ত্রিপুরা জেলার কালীকচ্ছ গ্রামে জন্ম হয় উল্লাসকরের। তাঁর পিতা দ্বিজদাস দত্ত ছিলেন একজন বিশিষ্ট কৃষিবিজ্ঞানী এবং সমাজ সংস্কারক। উচ্চশিক্ষিত এবং প্রগতিশীল পারিবারিক পরিমণ্ডলে বড় হওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই উল্লাসকরের চিন্তাভাবনায় এক দূরদর্শিতা তৈরি হয়েছিল। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর ভর্তি হন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে।
কিন্তু কলেজ জীবন থেকেই তাঁর রক্তে ফুটছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আগুন। সেই সময় বাংলায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে স্বদেশি ভাবাবেগ চরম রূপ নিয়েছে। কলেজে পড়ার সময়ই এক ইংরেজ অধ্যাপক ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত আপত্তিকর এবং কুৎসিত মন্তব্য করেন। তেজস্বী উল্লাসকর সেই অপমান সহ্য করতে পারেননি। তিনি সেই ব্রিটিশ অধ্যাপককে শারীরিকভাবে প্রহার করেন। ফলস্বরূপ, কলেজ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হতে হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থাপনাই যেন তাঁর বিপ্লবী জীবনের পথকে আরও প্রশস্ত করে দিল।
কলেজ ছাড়ার পর উল্লাসকর পুরোপুরি নিজেকে দেশের কাজে সঁপে দেন। এই সময়েই তাঁর আলাপ হয় বারীন্দ্রকুমার ঘোষের (ঋষি অরবিন্দের অনুজ) সাথে। বারীন্দ্রকুমারের হাত ধরেই তিনি যুক্ত হন বিখ্যাত ‘যুগান্তর’ দলের সাথে। উল্লাসকরের বিজ্ঞান ও রসায়নের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। সেই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তিনি মুরারিপুকুরের বাগানবাড়িতে গোপনে শক্তিশালী বোমা তৈরির গবেষণা শুরু করেন। তিনিই ছিলেন যুগান্তর দলের প্রথম সারির রসায়নবিদ ও বোমা তৈরির মূল কারিগর।
১৯০৮ সালের শুরুর দিকে উল্লাসকরের তৈরি করা বোমাই ব্যবহার করা হয়েছিল মুজফফরপুরের অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে। যদিও সেই অভিযানে ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকি ভুলবশত কিংসফোর্ডের পরিবর্তে দুই ইংরেজ মহিলার গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করেন। এই ঘটনার পর ব্রিটিশ পুলিশ নড়েচড়ে বসে এবং কলকাতার মুরারিপুকুর বাগানবাড়িতে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে উল্লাসকর দত্ত, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, অরবিন্দ ঘোষসহ বহু বিপ্লবীকে গ্রেপ্তার করে। যা ভারতের ইতিহাসে বিখ্যাত ‘আলিপুর বোমা মামলা’ নামে পরিচিত।
আলিপুর বোমা মামলার বিচার চলাকালীন ব্রিটিশ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও উল্লাসকরের মুখে কোনো ভয়ের চিহ্ন ছিল না। ১৯০৯ সালে বিশেষ আদালত উল্লাসকর দত্ত এবং বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে মৃত্যুদণ্ডে (ফাঁসি) দণ্ডিত করে। রায় শোনার পর আদালতের সমস্ত মানুষ যখন স্তব্ধ, তখন উল্লাসকর দত্ত এক অদ্ভুত অট্টহাসি হেসে ওঠেন। বিচারক অবাক হয়ে হাসির কারণ জানতে চাইলে উল্লাসকর গর্জে উঠে বলেন, "আমি হাসছি কারণ আমার বিশ্বাস, আমার মৃত্যুর পর ভারতের কোটি কোটি তরুণ বিপ্লবের পথে এগিয়ে আসবে এবং আপনাদের এই অত্যাচারী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হবে।"
পরবর্তী সময়ে অবশ্য উচ্চ আদালতে আপিলের পর উল্লাসকরের ফাঁসির সাজা মকুব করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং তাঁকে আন্দামানের সেলুলার জেলে নির্বাসনে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
আন্দামানের সেলুলার জেল বা ‘কালাপানি’ ছিল বিপ্লবীদের জন্য এক জীবন্ত নরক। সেখানে বন্দিদের ওপর যে অমানুষিক ও পাশবিক অত্যাচার চলত, তা ভাবলে আজও শিউরে উঠতে হয়। উল্লাসকরের মতো শিক্ষিত ও প্রথম সারির রাজনৈতিক বন্দিদের সাধারণ কয়েদিদের মতো খাটানো হতো। তাঁদের দিয়ে প্রতিদিনের নির্দিষ্ট কোটায় নারকেলের তেল পেষাই করার কাজ করানো হতো। রোদ-বৃষ্টির মধ্যে একটানা জোয়াল কাঁধে নিয়ে ঘানির চারপাশে ঘুরতে হতো তাঁদের। একটু ক্লান্তি দেখা গেলেই জেলের ওয়ার্ডাররা চাবুক দিয়ে চামড়া তুলে নিত। দেওয়া হতো পচা ও পোকা ধরা খাবার।
এই চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বহু বিপ্লবী আত্মহত্যা করেছিলেন, কেউ কেউ মারা যান রোগে। কিন্তু উল্লাসকর ছিলেন অনড়। তিনি জেলের ভেতরের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। প্রতিবাদ করায় তাঁকে একটানা শিকল দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হতো, দেওয়া হতো নির্জন কুঠুরির সাজা। দিনের পর দিন এই অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে করতে একসময় উল্লাসকরের স্নায়ু ভেঙে পড়ে। তিনি জেলের ভেতরেই তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন এবং একপর্যায়ে নিজের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে ১৯১২ সালে তাঁকে আন্দামানের জেল থেকে সরিয়ে মাদ্রাজের (বর্তমানে চেন্নাই) মানসিক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করে। দীর্ঘ ১৪ বছর সেই মানসিক হাসপাতালেই বন্দি জীবন কাটে এই মহান বিপ্লবীর।
১৯২৬ সালে উল্লাসকর দত্ত সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মুক্তি দেয়। কিন্তু কলকাতায় পা রাখার পর তিনি দেখেন, তাঁর চেনা বিপ্লবী পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে। তবু তিনি চুপ করে বসে থাকেননি। ১৯৩২ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনের কাজে যুক্ত থাকার অপরাধে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে আবারও গ্রেপ্তার করে এবং প্রায় বছর চারেক জেলে আটকে রাখে।
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলো। যে স্বাধীনতার জন্য উল্লাসকর তাঁর জীবনের সোনালী দিনগুলো, মেধা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিসর্জন দিয়েছিলেন, সেই স্বাধীন ভারত তাঁকে যোগ্য সম্মান দিতে পারেনি। দেশভাগের পর তিনি তাঁর পৈতৃক ভিটে কালীকচ্ছ গ্রামেই ফিরে যান। কিন্তু সেখানেও ওপার বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তিনি শান্তিতে থাকতে পারেননি। পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে তিনি শিলচরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
জীবনের শেষ দিনগুলোতে চরম একাকীত্ব এবং অর্থকষ্টের মধ্যে কাটাতে হয়েছে এই বীর বিপ্লবীকে। শিলচরের এক চিলতে ঘরে খবরের কাগজ পড়ে আর গুণগ্রাহীদের সাথে কথা বলেই কেটে যেত তাঁর সময়। অবশেষে ১৯৬৫ সালের ১৭ মে শিলচরেই নীরবে, লোকচক্ষুর আড়ালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ভারতের এই বীর সন্তান। বাংলার মাটির এই অকুতোভয় বিপ্লবীকে আজ হয়তো অনেকেই মনে রাখেনি, কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ এবং সাহসের কাহিনি ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের ভিত হয়ে চিরকাল রয়ে যাবে।

