প্রভুর বিধান মিঠা
শিখদের পঞ্চম গুরুকে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে যখন ফাঁসি দেওয়া হয় তখন গুরু অর্জুন বলেছিলেন, প্রভু তেরা কিয়া মিঠা লাগে, অর্থাৎ হে প্রভু! তোমার বিধান সর্বদাই মিষ্ট মনে হয়। অর্থাৎ সাধক, জীবনের পথে কোন তাপকেই কষ্ট বলে মনে করেন না। কেবল ভগবানের কৃপা বলেই বোধ হয়। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও আত্মোন্নতির পথ সহজ করতে বিচারের ধারা পরিবর্তন করতে হবে অর্থাৎ দৃষ্টিভঙ্গির মোড় ঘোরাতে হবে। একজন কুম্ভকার তামাক খাওয়ার ছিলিম তৈরি করত। হঠাৎ তার মনে পরিবর্তন হলো এবং সে তখন জলের কুঁজো বানাতে লাগল। লোকে কুঁজোর মাটিকে বললো, ওহে! হঠাৎ তোমার কী হলো, কুঁজো হয়ে এখন কী রকম লাগছে? কুঁজো বললো, দেখো, আগে এই মাটিতেই আমি ছিলিম হতাম, গলায় থাকতো আগুনের ডেলা আর প্রচেষ্টা থাকত কী করে লোককে মোহগ্রস্ত করব। আর এখন আমি কুঁজো, শীতল জলের ভান্ডার। এখন আমার সবসময় চেষ্টা থাকে কী করে লোকের পিপাসা নিবারণ করব। দেখো, জিনিস কিন্তু আমি একই—সেই মাটি, কিন্তু বিচারের পরিবর্তনের ফলে আমার নাম, চেহারা, স্বভাব সবই পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন সব লোকেরা আদর করে আমাকে ঘরে নিয়ে যায়। আরেকটি অনুরূপ উদাহরণ দেওয়া যায়। এক রানীর পায়ের আঙুলে একটি সোনার চুটকি ছিল। রানীর ইচ্ছা হলো পায়ের চুটকিটাকে লকেট তৈরি করে গলায় হারের সঙ্গে পড়বেন। সঙ্গে সঙ্গে রাজ স্যাকরাকে ডাকা হল। সেই রাণীমার জন্য ওই চুটকির সোনা দিয়ে খুব সুন্দর একটি লকেট বানিয়ে হারের সঙ্গে লাগিয়ে দিল। রাজপ্রাসাদের সকলেই কত সুন্দর লকেট লাগানো সোনার হারটি দেখে রাণীমাকে খুবই প্রশংসা করতে লাগলো। লোকে তখন লকেট কে জিজ্ঞাসা করল, ভাই এখন কেমন লাগছে? লকেট বলল, বন্ধু! আমি তো এক টুকরো সোনাই আছি কিন্তু চুটকি থেকে লকেট হওয়ায় আমার নামগত, স্থানগত ও গুণগত কত পরিবর্তনই না হয়েছে। এখন আমি সকলের বিস্ময় ও শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু ভাই এই স্থানে আসতে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে আর এসব হয়েছে স্যাকরার হাতে। প্রথমেই আমাকে স্যাকরা আগুনে ফেলল, তাপে দগ্ধ করতে করতে আমার মধ্যকার সমস্ত খাদ অর্থাৎ অহংকাররূপী বর্জ্য দূর করে উৎকৃষ্ট সোনা বানালো। তারপর ছাঁচে ফেলে আমাকে লকেটের গড়নে পিটিয়ে পিটিয়ে তৈরি করল। সবশেষে পালিশ করিয়ে তবেই না রাণীমার গলায় লকেট হিসেবে উঠে এসেছি! অর্থাৎ মানুষের জীবনেও যদি ভগবৎ-কৃপা হয় তবেই গুরুরূপী স্যাকরার ডাক পরে। গুরু নানা পরীক্ষা ও উপদেশের মাধ্যমে আমাদের মধ্যেকার অভিমান ও অহংকার দূর করে শুদ্ধ করে তোলেন।

