বাজার ও আবহাওয়া

সেনসেক্স
অপেক্ষা করুন...
আবহাওয়া (কলকাতা)
খোঁজা হচ্ছে...
সোনার দাম (১০ গ্রাম)
অপেক্ষা করুন...
১ মার্কিন ডলার (USD)
অপেক্ষা করুন...
লোড হচ্ছে...
logo
হট টপিক

কাজের দুনিয়ায় কৃত্রিম মেধার থাবা: আশঙ্কার চোরাস্রোত ও উত্তরণের পথ

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬
কাজের দুনিয়ায় কৃত্রিম মেধার থাবা: আশঙ্কার চোরাস্রোত ও উত্তরণের পথ
শেয়ার করুন :
facebook iconx iconlinkedin iconwhatsapp icon

বিশেষ প্রতিবেদন: চ্যাটজিপিটি (ChatGPT), মিডজার্নি বা কৃত্রিম মেধার (AI) নিত্যনতুন সংস্করণের দাপটে বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের বাজারে এক বড়সড় ওলটপালট শুরু হয়েছে। চাকুরিজীবী ও তরুণ প্রজন্মের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন— ‘এআই কি মানুষের কাজের জায়গা কেড়ে নিচ্ছে?’ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা এবং অর্থনৈতিক সংস্থাগুলির সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, মানুষের এই আশঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। তবে এর পাশাপাশিই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআই যেমন বহু মানুষের রোজগারে থাবা বসাচ্ছে, তেমনই তৈরি করছে কাজের নতুন দিগন্তও। এই প্রযুক্তির ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কীভাবে মানুষ নিজের অস্তিত্ব ও পেশা টিকিয়ে রাখবে, তা নিয়েই এই বিস্তারিত লেখা।

কাজের পরিধি কি সত্যিই কমছে? আশঙ্কার খতিয়ান
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF) এবং গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮.৫ থেকে ৯.২ কোটি মানুষের কাজ সরাসরি এআই এবং অটোমেশনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পিডব্লিউসি (PwC) এবং ম্যাককিনসে (McKinsey)-এর ২০২৬ সালের গ্লোবাল জব রিপোর্ট জানাচ্ছে যে, মূলত যেসব কাজ নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের মধ্যে বাঁধা এবং বারবার করতে হয় (Routine, rule-based tasks), সেগুলিই সবার আগে এআই-এর কবলে পড়ছে।
১. সবচেয়ে ঝুঁকিতে কোন কোন ক্ষেত্র?
•    ডেটা এন্ট্রি ও ব্যাক-অফিস অপারেশন: যেকোনো ধরণের তথ্য সাজানো, ফর্ম ফিল-আপ বা সাধারণ ফাইল ম্যানেজমেন্টের কাজ এখন নিমেষের মধ্যে নিখুঁতভাবে করে দিচ্ছে কৃত্রিম মেধা।
•    কাস্টমার সার্ভিস ও কল সেন্টার: উন্নতমানের এআই চ্যাটবট এবং ভয়েস এজেন্টরা মানুষের মতোই গ্রাহকদের সমস্যার সমাধান করছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী প্রথম স্তরের কাস্টমার কেয়ারের কাজ প্রায় ৮০% পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 
•    কনটেন্ট রাইটিং ও অনুবাদ: সাধারণ বিপণন বার্তা, পণ্যের বিবরণ এবং ভাষা অনুবাদের ক্ষেত্রে অনুবাদকদের কাজের সুযোগ দ্রুত কমছে।  
•    সাধারণ কোডিং: জুনিয়র স্তরের সফটওয়্যার ডেভেলপারদের কোড লেখার কাজ এখন এআই অ্যাসিস্ট্যান্টরা অনেক কম সময়ে করে দিচ্ছে।  
ম্যাককিনসের একটি সমীক্ষা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেছে যে, জেনারেটিভ এআই-এর কারণে বড় বড় সংস্থাগুলিতে এন্ট্রি-লেভেল বা একদম প্রাথমিক স্তরের চাকরির সুযোগ প্রায় ৫১ শতাংশ কমে গিয়েছে, যা নতুন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য কর্মসংস্থানের বাজারকে কঠিন করে তুলেছে। 
মুদ্রার উল্টো পিঠ: কাজের নতুন দিগন্ত
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই পরিস্থিতিকে 'চাকরির অবসান' হিসেবে দেখতে নারাজ। ইতিহাস সাক্ষী, শিল্প বিপ্লব বা কম্পিউটারের আবিষ্কারের সময়েও মানুষ একইভাবে কাজ হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই প্রযুক্তিই কোটি কোটি নতুন কাজের জন্ম দিয়েছিল।
সমীক্ষা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই-এর কারণে যেমন প্রায় ৯ কোটি চাকরি বিলুপ্ত হবে, ঠিক তেমনই নতুন ধারার প্রায় ১০ থেকে ১৭ কোটি নতুন কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ, সামাজিকভাবে কাজের মোট সংখ্যা কমবে না, বরং কাজের ধরণ বদলে যাবে। ইতিমধ্যেই ডেটা সায়েন্টিস্ট, এআই প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ার, সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট এবং এআই এথিক্স অফিসারের মতো সম্পূর্ণ নতুন পদের চাহিদা আকাশছোঁয়া হতে শুরু করেছে।
কীভাবে মোকাবিলা করবে মানুষ? উত্তরণের পাঁচ মূল চাবিকাঠি
আইবিএম (IBM)-এর প্রাক্তন সিইও গিনি রোমেট্টি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছিলেন, “এআই মানুষের জায়গা নেবে না, কিন্তু যে মানুষটি এআই ব্যবহার করতে জানেন, তিনি সেই মানুষকে সরিয়ে দেবেন যিনি এআই জানেন না”। এই নতুন যুগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে মানুষের সামনে প্রধান পাঁচটি পথ খোলা রয়েছে:
১. রিস্কিলিং এবং আপস্কিলিং (নিত্যনতুন দক্ষতা অর্জন): নিজের পুরনো দক্ষতার ওপর ভরসা করে বসে থাকার দিন শেষ। কর্মজীবনে টিকে থাকতে গেলে এআই টুলসগুলি কীভাবে কাজ করে, তা শিখতে হবে (AI Literacy)। কোডিং না জানলেও কীভাবে এআই-কে দিয়ে নিজের কাজ করিয়ে নেওয়া যায় (যেমন প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং), তা রপ্ত করতে হবে।  
২. ‘হিউম্যান স্কিল’ বা মানবিক দক্ষতায় শান দেওয়া: এআই যতই বুদ্ধিমান হোক না কেন, মানুষের আবেগ, সহানুভূতি (Empathy), জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং দলগত নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলীর কোনো বিকল্প যন্ত্রের কাছে নেই। যে সমস্ত কাজে গভীর মানবিক সংযোগ বা অনুভূতি প্রয়োজন, যেমন— শিক্ষকতা, মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং, নার্সিং বা উচ্চস্তরের ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণ, সেই ক্ষেত্রগুলি চিরকাল মানুষের দখলেই থাকবে।
৩. সৃজনশীলতা এবং মৌলিক চিন্তাভাবনা: এআই মূলত ইন্টারনেটে থাকা পুরনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নতুন কিছু তৈরি করে। কিন্তু একদম নতুন এবং মৌলিক কোনো সৃষ্টিশীল আইডিয়া বা ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি কেবল মানুষের মস্তিষ্ক থেকেই আসা সম্ভব। তাই সৃজনশীল কাজের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। 
৪. আজীবন শিক্ষার মানসিকতা (Lifelong Learning): প্রযুক্তির পরিবর্তন এখন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে হচ্ছে। তাই শিক্ষাজীবন শেষ মানেই পড়ালেখা শেষ— এই ধারণা বদলে ফেলে প্রতিনিয়ত অনলাইন কোর্স, ওয়ার্কশপ এবং সার্টিফিকেশনের মাধ্যমে নিজেকে বাজারের চাহিদার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক রাখতে হবে। 
৫. যুগলবন্দী (Human-in-the-loop): এআই-কে প্রতিপক্ষ না ভেবে তাকে নিজের সহকারী বা অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করতে শিখতে হবে। এআই খসড়া বা প্রাথমিক ডেটা তৈরি করে দেবে, আর মানুষ তার বিচারবুদ্ধি (Judgment) দিয়ে সেটিকে চূড়ান্ত রূপ দেবে। এই যুগলবন্দী কাজের উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। 
এআই মানুষের জন্য কোনো অভিশাপ নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। ক্ষুর যেমন চুল কাটার কাজেও লাগে, আবার অসাবধানে হাতও কেটে যেতে পারে, এআই-ও ঠিক তেমন। যারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবেন না, তাঁদের জন্য আগামী দিন কঠিন। কিন্তু যারা নিজেদের সময়ের উপযোগী করে গড়ে তুলবেন, তাঁদের জন্য এই কৃত্রিম মেধার যুগই নিয়ে আসবে অভূতপূর্ব সাফল্যের সুযোগ।