সর্বশেষ খবর
ভারতের সাইকেল বিপ্লবের বাঙালি রূপকার: শিল্পপতি সুধীরকুমার সেন
প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট, ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদনঃ আজ ২৮ আগস্ট। ভারতের শিল্প ইতিহাসের এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অথচ বিস্মৃতপ্রায় দিন। আজ থেকে বহু বছর আগে এই দিনেই মারা গিয়েছিলেন ভারতের সাইকেল শিল্পের অন্যতম প্রধান কারিগর, দূরদর্শী বাঙালি শিল্পপতি সুধীরকুমার সেন (এস কে সেন)। ১৯৫০ এবং ৬০-এর দশকে, যখন সদ্য স্বাধীন ভারত নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে স্বনির্ভরতার স্বপ্ন দেখছে, ঠিক সেই সময়ে এই বাঙালি উদ্যোক্তা ভারতের আমজনতার যাতায়াতের মাধ্যমকে আমূল বদলে দেওয়ার ব্রত নিয়েছিলেন।
তাঁর হাত ধরেই বিশ্ববিখ্যাত ব্রিটিশ সাইকেল ব্র্যান্ড ‘র্যা লে’ (Raleigh) এ দেশের মাটিতে পা রাখে। পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের কাছে কন্যাপুরে গড়ে উঠেছিল এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম সাইকেল কারখানা ‘সেন-র্যা লে’ (Sen-Raleigh)। আজ এই প্রথিতযশা বাঙালি শিল্পপতির প্রয়াণ দিবসে তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও ভারতীয় শিল্পে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানকে নিয়ে স্বতন্ত্র খবরের বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য।
ধীরকুমার সেনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এমন এক সময়ে, যখন বাংলায় তথা ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। তবে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা যে একটি জাতির মেরুদণ্ড গঠন করতে পারে, তা সুধীরবাবু খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতের বাজারে সাইকেল ছিল মূলত একটি আমদানিকৃত বিলাসবহুল পণ্য। সাধারণ মানুষের পক্ষে সাইকেল কেনা ছিল আকাশকুসুম কল্পনা। প্রধানত ব্রিটেন থেকে সম্পূর্ণ তৈরি সাইকেল ভারতে আসত এবং তা চড়া দামে বিক্রি হতো।
সুধীরকুমার সেন চাইলেন এই পরিস্থিতির বদল ঘটাতে। তিনি ব্যবসা শুরু করেছিলেন সাইকেলের খুচরো যন্ত্রাংশ আমদানি ও বিক্রির মাধ্যমে। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য কেবল আমদানিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন ভারতের বুকেই গড়ে উঠুক নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা, যাতে সস্তায় দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দ্বিচক্রযান পৌঁছে দেওয়া যায় দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে। এই ভাবনার ওপর ভিত্তি করেই তিনি ‘সেন অ্যান্ড পন্ডিত’ (Sen & Pandit) কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থাটি প্রাথমিক স্তরে সাইকেলের যন্ত্রাংশ এবং বিদেশি সাইকেলের পরিবেশক হিসেবে কাজ শুরু করলেও, এটিই পরবর্তীতে ভারতের সাইকেল বিপ্লবের বীজ রোপণ করেছিল।
১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে, ভারত যখন স্বাধীনতার দোরগোড়ায়, সুধীরকুমার সেন বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল ছোটখাটো উৎপাদন দিয়ে দেশের বিশাল চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিশ্বমানের প্রযুক্তি এবং বড় আকারের কারখানা। সেই সময়ে বিশ্বের সেরা সাইকেল প্রস্তুতকারক সংস্থা ছিল ব্রিটেনের ‘র্যা লে সাইকেল কোম্পানি’ (Raleigh Cycle Company)।
সুধীরবাবু দক্ষতার সঙ্গে ব্রিটেনের ‘র্যা লে’ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেই যুগে একজন ভারতীয় উদ্যোক্তার পক্ষে একটি বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ সংস্থাকে ভারতে যৌথ উদ্যোগে কারখানা গড়ার জন্য রাজি করানো ছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। কিন্তু সুধীরকুমারের অসামান্য ব্যবসায়িক বুদ্ধি, সততা এবং ভারতের বিশাল বাজারের সম্ভাবনাকে নিখুঁতভাবে তুলে ধরার ক্ষমতার কাছে ব্রিটিশ কর্তারা মাথা নোয়াতে বাধ্য হন। ১৯৪৯ সালে ভারতের মাটিতে ‘সেন-র্যা লে ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ (Sen-Raleigh Industries of India Ltd.) প্রতিষ্ঠার চুক্তি সই হয়। এটি ছিল তৎকালীন ভারতের শিল্প ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ঘটনা।
চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর অধুনা পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোলের কাছে কন্যাপুরে (Kanyapur) এক বিশাল অঞ্চল জুড়ে গড়ে ওঠে ‘সেন-র্যা লে’র কারখানা। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায়ের শিল্পায়নের নীতির সঙ্গে সুধীরবাবুর এই উদ্যোগ পুরোপুরি মিলে গিয়েছিল। রাজ্য সরকারের তরফ থেকেও এই কারখানার জন্য জমি ও অন্যান্য পরিকাঠামোগত সাহায্য দেওয়া হয়।
১৯৫২ সাল থেকে কন্যাপুরের এই কারখানায় বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। অতি দ্রুত এই কারখানা ভারতের শিল্প মানচিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেয়। ‘র্যা লে’, ‘রবিন হুড’ (Robin Hood), ‘হম্বার’ (Humber) এবং ‘রুজ’ (Rudge)-এর মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের সাইকেল এবার ভারতের নিজস্ব কারখানায় তৈরি হতে শুরু করে। তবে শুধু বিদেশি ব্র্যান্ড নয়, সুধীরবাবু নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘সেন-র্যা লে’ নামেও সাইকেল বাজারে আনেন, যা মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল।
কন্যাপুরের এই কারখানাটি কেবল একটি উৎপাদন কেন্দ্র ছিল না, এটি ছিল একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প শহর। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল এই কারখানায়। আসানসোল-দুর্গাপুর অঞ্চলের অর্থনৈতিক চেহারা বদলে দেওয়ার পেছনে সেন-র্যা লে কারখানার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তৎকালীন সময়ে এই কারখানায় তৈরি সাইকেলের গুণগত মান এতটাই উন্নত ছিল যে, তা ব্রিটেনের মূল কারখানার উৎপাদিত সাইকেলের সমকক্ষ বলে বিবেচিত হতো এবং বিদেশেও রপ্তানি করা হতো।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সাইকেলকে হয়তো আমরা কেবল একটি সাধারণ বাহন বা ব্যায়ামের মাধ্যম হিসেবে দেখি। কিন্তু ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশকের ভারতে সাইকেল ছিল একটি পরিবারের অন্যতম প্রধান সম্পদ। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভারতীয়দের কাছে সাইকেল ছিল অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক।
চাকরিজীবী থেকে শুরু করে দুধের ব্যবসায়ী, খবরের কাগজের হকার, ডাকবাবু বা স্কুলের শিক্ষক—সবার জন্যই সাইকেল ছিল যাতায়াতের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ভরসা। সুধীরকুমার সেনের দূরদর্শিতার কারণেই ভারতের ঘরে ঘরে এই বাহনটি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। ‘সেন-র্যা লে’ সাইকেলগুলি ছিল অত্যন্ত মজবুত এবং দীর্ঘস্থায়ী। ভারতীয় রাস্তার রুক্ষ বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই এগুলি তৈরি করা হতো। “সেন-র্যা লে সাইকেল—বছরের পর বছর চলে নির্ভীক” (Sen-Raleigh Cycles - Runs Year After Year)—এই ধরনের বিজ্ঞাপনী স্লোগান তৎকালীন সময়ে ভারতের মানুষের মুখে মুখে ঘুরত।
"বাঙালিরা ব্যবসা করতে পারে না"—এই অপবাদ সমাজ থেকে মুছে ফেলার লড়াইয়ে সুধীরকুমার সেন ছিলেন এক অন্যতম যোদ্ধা। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় যেমন বেঙ্গল কেমিক্যালের মাধ্যমে বাঙালির ব্যবসায়িক মেধার প্রমাণ দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং ও উৎপাদন শিল্পের ক্ষেত্রে সুধীরকুমার সেন প্রমাণ করেছিলেন যে একজন বাঙালিও আন্তর্জাতিক স্তরের শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারে। তাঁর দূরদর্শিতা কেবল সাইকেল উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ‘সেন অ্যান্ড পন্ডিত’ গ্রুপের মাধ্যমে অন্যান্য শিল্প ক্ষেত্রেও পা রেখেছিলেন এবং বাংলার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চেয়েছিলেন।
তিনি কর্মী কল্যাণে অত্যন্ত বিশ্বাসী ছিলেন। কন্যাপুর কারখানার শ্রমিকদের জন্য আবাসন, বিদ্যালয়, চিকিৎসালয় এবং বিনোদনের সুবন্দোবস্ত করেছিলেন তিনি। শিল্পক্ষেত্রে মালিক ও শ্রমিকের সুসম্পর্ক যে উৎপাদনের মান উন্নত করতে পারে, সুধীরবাবু তাঁর কারখানায় তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
কিন্তু সব সোনালী অধ্যায়েরই একটা সমাপ্তি থাকে। ১৯৭০-এর দশকে ভারতের শিল্প ক্ষেত্রে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে, এক অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তীব্র শ্রমিক অসন্তোষ, নকশাল আন্দোলন এবং ক্রমাগত লকআউট বা ধর্মঘটের সংস্কৃতির গ্রাসে পড়ে বাংলার বহু ঐতিহ্যবাহী শিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত, সেন-র্যা লে কারখানাও এই ঝড়ের হাত থেকে রেহাই পায়নি।
শ্রমিক অসন্তোষ এবং কাঁচামালের অভাবের কারণে কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে শুরু করে। একই সঙ্গে ভারতের বাজারে উত্তর ভারতের অন্যান্য সাইকেল প্রস্তুতকারক সংস্থা যেমন ‘হিরো’ (Hero) বা ‘অ্যাটলাস’ (Atlas) কম খরচে ও নতুন প্রযুক্তিতে সাইকেল উৎপাদন করে বাজার দখল করতে শুরু করে। সেন-র্যা লে তার ঐতিহ্য ও গুণগত মান বজায় রাখলেও তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। পরবর্তীতে ভারত সরকার এই ঐতিহ্যবাহী সংস্থাকে বাঁচানোর জন্য এটিকে জাতীয়করণ (Nationalisation) করে এবং নাম বদলে রাখা হয় ‘সাইকেল কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া’ (Cycle Corporation of India)। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আধুনিকীকরণের অভাবে শেষ পর্যন্ত এই গৌরবময় কারখানার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
আজ আসানসোলের কন্যাপুরের সেই বিশাল কারখানা হয়তো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, কারখানার সাইরেন আজ আর ভোরে মেহনতি মানুষকে ডেকে তোলে না। কিন্তু ভারতের সাইকেল নির্মাণের ইতিহাসে সুধীরকুমার সেনের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি কেবল একটি কারখানা গড়ে তোলেননি, তিনি স্বাধীন ভারতের লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকে গতি দিয়েছিলেন, স্বনির্ভরতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।
আজকের ‘স্টার্ট-আপ’ এবং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র যুগে দাঁড়িয়ে সুধীরকুমার সেনের জীবন ও কর্ম অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি আজ থেকে সাত দশক আগেই ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র বাস্তব রূপায়ণ ঘটিয়েছিলেন বাংলার মাটিতে। ২৮ আগস্ট তাঁর প্রয়াণ দিবসে বাংলার এই মহান শিল্প-পথিকৃৎকে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। বাঙালির শিল্প ভাবনার পুনর্জাগরণের জন্য সুধীরকুমার সেনের মতো মাটির সন্তানদের ইতিহাস আজ নতুন প্রজন্মের কাছে বারবার তুলে ধরা প্রয়োজন।

