জাতীয় জীবনে রক্ত
গীতার চতুর্থ অধ্যায়ের একটি শ্লোকে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত বাসনা শূন্য, সংযত দেহ মন, সব রকম ভোগ্য বস্তু ত্যাগী ব্যক্তি কেবল শরীর উপযোগী কর্ম মাত্র করেন বলে পাপ পুণ্যরূপ কোন কর্মফলের ভাগী হন না। 'আমি এটা চাই আমি ওটা চাই', সর্বদাই মনে মনে সৌধ নির্মাণ করছি। এরূপ মনোভাব থেকে মুক্ত মন অনেক বেশি স্থির হয়। যার মন সু সংযত, এটা ওটা গ্রহণেচ্ছাশূন্য তার মন স্থির। আজকাল এই গ্ৰহণেচ্ছা খুবই প্রবল,তাই এত ভ্রষ্টাচার, চুরি,ডাকাতি। আত্মমর্যাদা অকিঞ্চিৎকর হয়ে গেছে। 'আমার যা প্রাপ্য তা আমার কাছে আসবে, অথবা আমি কখনো এর পিছনে ছুটি নি, এটি আমার কাছে এসেছে'- এইরূপ মনোভাবের লোকের সংখ্যা খুবই কম। অবশ্য একমাত্র ন্যায়ে প্রতিষ্ঠিত সমাজেই যার যা প্রাপ্য সে ঠিক তা পেয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের সমাজ ন্যায়ের পথে চলে না। সমাজে এখন অন্যায়েরর প্রাদুর্ভাব খুবই বেশি, বহু চেষ্টা করেও ন্যায্য প্রাপ্য পাওয়া যায় না। আমি আমার কাজ ভালোভাবেই করে যাব, আমার যা প্রাপ্য অমি তা পেয়ে যাব—এ অতি উচ্চ আধ্যাত্মিক মনোভাব। যে সমাজে ন্যায়বিচারের অভাব সেখানে শান্তি নেই। সেখানে সর্বদাই একটা মানসিক চাপ। আমাদের বর্তমান সমাজে আইন ও ন্যায় প্রায়ই সমতালে চলেনা। আইন চলে একদিকে ন্যায় চলে অন্যদিকে। সেই সমাজকেই সুস্থ সমাজ বলা যায় যেখানে আইন ও ন্যায় সমতালে চলে। এখানেই প্রয়োজন গীতার মহান শিক্ষা। এই শিক্ষা নেই বলেই ন্যায়- নীতি বর্জিত সমাজ আমরাই তৈরি করেছি। স্বামীজি বলছেন, সমাজের উন্নতির জন্য ধর্মকে নষ্ট করবার কোন দরকার নেই। ধর্মের জন্যই যে সমাজের এই অবস্থা তা নয়, বরং ধর্মকে সামাজিক ব্যাপারে যেভাবে কাজে লাগানো উচিত, তা হয়নি বলেই সমাজের এই অবস্থা। ভারতবর্ষের প্রাণশক্তি রয়েছে ধর্মে। যতদিন পর্যন্ত হিন্দু জাতি তার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে প্রাপ্ত মহান উত্তরাধিকার বিস্মৃত না হয়, ততদিন জগতের কোনও শক্তি তাদের ধ্বংস করতে পারবে না। যদি রক্ত সতেজ ও পরিষ্কার থাকে, তাহলে মানুষের শরীরে কোন রোগ জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে না। ধর্মই আমাদের জাতীয় জীবনের রক্ত। যদি সেই "রক্ত" প্রবাহ চলাচলের কোন বাধা না থাকে, যদি এই "রক্ত" বিশুদ্ধ থাকে তবে রাজনৈতিক সামাজিক বা অন্য যেকোনো ধরনের বাহ্যিক ত্রুটি এমনকি দেশের দারিদ্র্য পর্যন্ত দূর হয়ে যাবে। তোমরা যদি ধর্মকে কেন্দ্র না করে ধর্মকেই জাতীয় জীবনের প্রাণশক্তি না করে রাজনীতি, সমাজনীতি বা অন্য কিছুকে তার জায়গায় বসাও তবে তোমরা একেবারেই লুপ্ত হয়ে যাবে।

