ধর্ম লোকদেখানো নয়
আমাদের উপনিষদের মহান নির্দেশ হলো—মানুষ যদি বাইরের পরিবেশকে সুস্থ রাখে বহির্বিজ্ঞানের সাহায্যে, এবং অন্তর জগতের পরিবেশকে সুস্থ রাখে অধ্যাত্মবিজ্ঞানের সাহায্যে, তবেই মানুষের জীবন পরিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, অন্যভাবে নয়। কিন্তু আধুনিক সভ্য জগত যান্ত্রিক সভ্যতার বাতাবরণে নিমগ্ন। ফলে বহির্জগতের অর্থ, ঐশ্বর্য, ভোগসুখের মাঝখানে মানুষ ক্রমশ ভিতর থেকে দরিদ্র হয়ে পড়ছে এবং এক শূন্যতার শিকার হয়ে উঠছে। সেই কারণে শিশু-অপরাধ, আত্মহত্যা, মাদক জাতীয় নেশার দাসত্ব সমাজে বেড়েই চলেছে। এর প্রধান কারণ, মানুষ অন্তরে দুঃখী, একাকী ও ইন্দ্রিয়সুখ-নির্ভর। আমাদের উপনিষদের ঋষিগণ এই কথা অনেক আগেই ভেবেছেন। তাই সুপ্রাচীন শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে বলা হয়েছে— যদা চর্মবদাকাশং বেষ্টয়িষ্যন্তি মানবাঃ। তদা দেবমবিজ্ঞায় দুঃখস্যান্তো ভবিষ্যতি।। যদিও মানুষ তার কারিগরি কলাকৌশল দিয়ে এই বাইরের পরিবেশকে এক টুকরো চামড়ার মত নিজ আয়ত্তে হয়তো গুটিয়ে আনতে পারে, কিন্তু জ্যোতির্ময় অন্তরাত্মার উপলব্ধি ছাড়া তার দুঃখের নিবৃত্তি অসম্ভব। আধুনিক মানুষের কাছে সে নিজেই তার এক বড় বোঝা ও সমস্যা। নিজেকে নিয়ে তার যে সমস্যা সেটা আরও বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল, আরো কারিগরি কায়দা, জীবন উপভোগের নানা উপকরণ— এ সবকিছু দিয়েও সে সমাধান করতে পারছে না। নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটিয়ে, মনুষ্য জীবনের নানা জৈবিক অবস্থানকে বদলে দিয়েও কোনভাবেই সে এই সমস্যা দূরীভূত করতে পারছে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে অধ্যাত্মবিজ্ঞানের আশ্রয় নিচ্ছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলছেন—আপনারা মনে রাখবেন, শুধু কথা বলায় ধর্ম নেই বা গ্রন্থের মধ্যেও নেই—ধর্ম অপরোক্ষানুভূতি। ধর্ম কোনরূপ বিদ্যার্জন নয়, ধর্ম আদর্শ স্বরূপ হয়ে যাওয়া। ধর্ম হচ্ছে মানুষের ভেতর যে ব্রহ্মত্ব প্রথম থেকেই বর্তমান তারই প্রকাশ। ইন্দ্রিয় সুখ মানব জীবনের লক্ষ্য নয়। অধ্যাত্মজ্ঞানই সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান। একমাত্র এই জ্ঞান লাভ করলে সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ আসবে।

