বুদ্ধদেব গুহর সঙ্গে জঙ্গলে
২৯শে জুন বুদ্ধদেব গুহর জন্মদিন। বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু লেখক আছেন, যাদের বই পড়া মানে শুধু গল্প পড়া নয়, একটা নির্দিষ্ট ভূগোলের মধ্যে প্রবেশ করা। বুদ্ধদেব গুহ সেই বিরল লেখকদের একজন। তার লেখা পড়লেই মনে হয়, শহরের কংক্রিটের দেওয়াল ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে; সামনে খুলে যাচ্ছে শাল, সেগুন, সিমুল, মহুয়ার অন্তহীন জঙ্গল। দূরে কোথাও ডেকে উঠছে ধনেশ, বাতাসে ভেসে আসছে শুকনো পাতার গন্ধ। পাঠক তখন আর পাঠক থাকে না, হয়ে ওঠে সেই জঙ্গলেরই এক নীরব পথিক।
বুদ্ধদেব গুহ প্রকৃতিকে কখনও নিছক দৃশ্য হিসেবে দেখেননি। তার কাছে জঙ্গল ছিল জীবনের এক মহাগ্রন্থ। গাছ, নদী, পাহাড়, বন্যপ্রাণী—সবাই যেন তার সাহিত্যে সমান মর্যাদার চরিত্র। মানুষের লোভ, ভালোবাসা, নিঃসঙ্গতা কিংবা আত্মঅন্বেষণের গল্প প্রকৃতির বুকেই তিনি সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে বলতে পেরেছেন। তাই তার অরণ্য আমাদের শুধু মুগ্ধ করে না, ভাবায়ও।
তার সৃষ্ট ঋজুদা বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য চরিত্র। সাহসী, জ্ঞানী, সংযত এবং প্রকৃতিপ্রেমী ঋজুদা আমাদের শিখিয়েছে, জঙ্গল জয় করার জায়গা নয়; তাকে জানতে হয়, বুঝতে হয়, সম্মান করতে হয়। ঋজুদার চোখ দিয়ে আমরা যেমন বাঘ দেখি, তেমনি দেখি মানুষের ভেতরের বন্যতাকেও। এই চরিত্রের জনপ্রিয়তার কারণ শুধু রোমাঞ্চ নয়, তার গভীরে লুকিয়ে থাকা জীবনবোধ।
বুদ্ধদেব গুহর লেখায় প্রেমও এসেছে এক অন্য আলোয়। সেখানে আবেগ আছে, কিন্তু বাড়াবাড়ি নেই; আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু কৃত্রিমতা নেই। তার চরিত্ররা ভালোবাসে, আবার হারিয়েও ফেলে। সেই হারানোর বেদনাও তিনি লিখেছেন এমন সংযত ভাষায়, যা পাঠকের মনে দীর্ঘদিন থেকে যায়। তার গদ্যের সুর যেন অনেকটা জঙ্গলের সন্ধ্যের মতো—নিরিবিলি, গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী।
আজকের সময়ে যখন প্রকৃতি ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, তখন বুদ্ধদেব গুহকে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন আরও বেড়েছে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, মানুষ প্রকৃতির বাইরে নয়; বরং তারই একটি অংশ। বন কেটে সভ্যতা গড়া যায়, কিন্তু বনহীন পৃথিবীতে মানুষের মন ক্রমশ অনুর্বর হয়ে পড়ে। এই উপলব্ধি তার লেখার পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে।
বুদ্ধদেব গুহর জন্মদিন তাই শুধু একজন সাহিত্যিককে স্মরণ করার দিন নয়। এটি এমন এক সাহিত্যদর্শনকে ফিরে দেখার দিন, যা আমাদের প্রকৃতির কাছে নিয়ে যায়, মানুষের কাছে নিয়ে যায়, এবং শেষ পর্যন্ত নিজের কাছেও ফিরিয়ে আনে। তার বই বন্ধ করার পরও যেন কানে বাজতে থাকে জঙ্গলের নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার সাহিত্যের সবচেয়ে বড় উচ্চারণ।
সময় বদলায়, পাঠকের রুচিও বদলায়। কিন্তু কিছু সাহিত্য কখনও পুরোনো হয় না। বুদ্ধদেব গুহর জঙ্গল তাই আজও ততটাই সবুজ, তার নদী আজও ততটাই প্রবহমান, তার চরিত্ররা আজও ততটাই জীবন্ত। তাই তার জন্মদিনে তাকে স্মরণ করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হয়তো আবার একবার জঙ্গলে ফিরে যাওয়া—তার শব্দের হাত ধরে।

