বিবেকানন্দ, বেলুড় মঠ ও শ্রীরামকৃষ্ণ বিগ্রহ
পর্ব -১
স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর অতি প্রিয় গুরুভাই স্বামী ব্রহ্মানন্দকে ১৩/০৭/১৮৯৭ সালে কাশীপুরের ভাড়া করা বাগানবাড়িকে লক্ষ্য করে চিঠিতে লিখেছিলেন, ও-বাগানের সহিত আমাদের সমস্ত
Association। বাস্তবিক এটাই আমাদের প্রথম মঠ; কিন্তু কালক্রমে তিনি উপলব্ধি করলেন স্থায়ী মঠের প্রয়োজন। এই স্থায়ী মঠ হবে রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনের পীঠস্থান। কিন্তু কোথায়
হবে সেই মঠ? কয়েকজন গুরুভাইকে তিনি বলেছিলেন,something tells me that our permanent
Math will be in the neighbourhood across the river.
রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনে তাই কাশীপুর, বরাহনগর বা আলমবাজারের গুরুত্ব ব্যাপক হলেও বেলুড়
মঠ, স্থায়ী মঠ হিসাবে তার স্বতন্ত্রতায় উজ্জ্বল।
অখন্ডের ঘরের ঋষি নরেন্দ্রনাথের ধ্যান ভাঙিয়ে এই জগতে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন এখানকার মানুষের ঘুম ভাঙানোর জন্য। ঋষি নরেন্দ্রনাথ স্থায়ী মঠ স্থাপনের জন্য পৃথিবীর শুস্ক ধূলায় প্রাণপাত পরিশ্রম করেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ ত্যাগকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন - বাহ্য ত্যাগ এবং মনের ত্যাগ। গৃহীদের জন্য তাঁর নির্দেশ মনের ত্যাগের। সন্ন্যাসীরা বাহ্য এবং অন্তর ত্যাগ দুইই ত্যাগ করবে। শ্রীরামকৃষ্ণ
সন্ন্যাসী এবং গৃহীর জীবনে পূর্ণতা দানের জন্য যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা যাপন করার জন্য স্থায়ী মঠের প্রয়োজন বিবেকানন্দ তা বুঝেছিলেন অতি দ্রুত।
স্থায়ী মঠের জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে জমির সন্ধান করা শুরু হল। কামারহাটি, পানিহাটিতে গোবিন্দ চৌধুরীর বাগানবাড়ি, দক্ষিণেশ্বর প্রভৃতি একাধিক জায়গায় জমির সন্ধান পাওয়া গেলেও বিভিন্ন
কারণে তা বাতিল হয়। এদিকে তৎকালীন মঠ, আলামবাজার মঠবাড়িটি ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। জমির সন্ধান শুরু হল জোর কদমে৷ অবশেষে সন্ধান পাওয়া গেল বেলুড়ের জমির। গঙ্গার
পশ্চিম দিকে পাটনার বাসিন্দা ভাগবত নারায়ণ সিংহের থেকে ১৮৯৮ সালে ৪ মার্চ মাঝারি দুটি বাড়ি সমেত প্রায় বাইশ বিঘে জমি কেনা হল। কত টাকায় কেন হল জমি? কেমন ছিল সেই জমি?
বিবেকানন্দের লেখায় পাওয়া যায়, Miss Muller got us to buy a piece of land which cost 40,000 Rs. - and about 4,000 to level it and fill up the huge gaps in it, as it was a
dockyar.
শ্রীমা সারদাদেবী বেলুড় মঠের জমি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ঠাকুরের ইচ্ছাতেই ঐ জমি হলো। তিনিই মঠের জন্য ঐ স্থানটি নির্বাচন করেছিলেন।‘ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শ্রীরামকৃষ্ণ
নেপালের রাজার প্রতিনিধি বিশ্বনাথ উপাধ্যায়ের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বেলুড়ে এসেছিলেন। সেদিন তাঁর পাদস্পর্শে ধন্য হয়েছিল এই জমি। নেপালের রাজার কাঠের ডিপো ছিল এখানে। বিশ্বনাথ
উপাধ্যায় ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের স্নেহের ‘কাপ্তেন’। সুতরাং একথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, পরবর্তীকালে যে জমিতে বেলুড় মঠের মত একটি সর্বধর্ম সমন্বয়ী আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠান গড়ে
উঠবে এবং যা ভাবীকালের মানুষের কাছে অতন্দ্র সাধনার ভূমি হয়ে উঠবে তা পূর্ব নির্ধারিত।
বোধহয় পূর্ব নির্ধারিত ছিল বলেই কামারহাটি, দক্ষিণেশ্বর বা পানিহাটি প্রভৃতি জায়গার জমি বাতিল হয়েছিল।
১৮৯৮ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি বিবেকানন্দ তাঁর গুরুভাই স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে লিখছেন, ‘যে জমি কেনা হইয়াছে, আজ আমরা উহার দখল লইব এবং যদিও এখনি ঐ জমিতে মহোৎসব করা
সম্ভবপর নহে, তথাপি রবিবারে (২৭ ফেব্রুয়ারি) উহার উপর আমি কিছু না কিছু করাইব। অন্তত “শ্রীজী”র ভস্মাবশেষ, ঐ দিনের জন্য আমাদের নিজস্ব জমিতে লইয়া গিয়া পূজা করাইতে হইবে।’
“শ্রীজী” অর্থাৎ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পূতাস্থি। নতুন জমিতে বিবেকানন্দ নিজে কাঁধে করে সেই পবিত্র অস্থি স্থাপন করে পূজা করেছিলেন।
(চলবে)...

