শেষ মুহূর্তের ম্যাজিক, ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ১৬-তে রোনাল্ডোর পর্তুগাল
নিজস্ব প্রতিনিধি: শেষ মুহূর্তের চরম নাটকীয়তা এবং ভিএআর (VAR) বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর টিকিট পাকা করল পর্তুগাল. কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামে নকআউট পর্বের (রাউন্ড অব ৩২) ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে দিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর দল।
পর্তুগালের হয়ে পেনাল্টি থেকে প্রথম গোলটি করেন অধিনায়ক রোনাল্ডো নিজে এবং অতিরিক্ত সময়ে দলের জয়সূচক গোলটি আসে পরিবর্ত হিসেবে নামা গনসালো র্যামোসের হেড থেকে। এই হারের ফলে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো লুকা মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়াকে, যা সম্ভবত কিংবদন্তি মদ্রিচের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হয়ে রইল।
ম্যাচের শুরু থেকেই দাপট দেখাতে শুরু করে পর্তুগাল। ৪ মিনিটের মাথায় ব্রুনো ফের্নান্দেস পরপর দু'টি দুর্দান্ত শট নিলেও ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচ তা রুখে দেন। প্রথমার্ধে প্রায় ৭০ শতাংশ বল নিজেদের দখলে রাখলেও ক্রোয়েশিয়ার জমাট রক্ষণ ভাঙতে ব্যর্থ হন রোনাল্ডোরা। ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্যভাবেই।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচে বড়সড় ধাক্কা খায় পর্তুগাল। ৫৩ মিনিটের মাথায় ইয়োসিপ স্তানিশিচের নিখুঁত পাস থেকে বাঁ পায়ের দারুণ শটে ক্রোয়েশিয়াকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন ইভান পেরিসিচ। এর ঠিক সাত মিনিট পর জোয়াও কানসেলোর পাস থেকে রোনাল্ডো বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়ে যায়। তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি, ৬৮ মিনিটে বক্সের মধ্যে ফাউল করার কারণে পেনাল্টি পায় পর্তুগাল।
স্পটকিক থেকে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় গোল করে দলকে ১-১ সমতায় ফেরান ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। এই গোলের সঙ্গেই নিজের ক্যারিয়ারে এক নতুন নজির গড়লেন ৪১ বছর বয়সী সি আর সেভেন, এটি ছিল তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ নকআউট গোল। কোচ মার্টিনেজের জুয়া ও র্যামোসের জয়সূচক গোলম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই ৮০ মিনিটে এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নেন পর্তুগালের কোচ রবের্তো মার্টিনেজ।
তিনি মাঠ থেকে তুলে নেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে, যার বদলে মাঠে নামানো হয় রুবেন নেভেসকে এবং আক্রমণে আনা হয় গনসালো র্যামোসকে।
কোচের এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ১০০ শতাংশ সফল প্রমাণিত হয়। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষ হওয়ার পর সংযুক্ত সময়ের (৯০+৪ মিনিটে) রাফায়েল লিয়াওয়ের বাঁ দিক থেকে বাড়ানো চমৎকার ক্রস থেকে অনবদ্য এক হেডে গোল করে পর্তুগালকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন সুপার-সাব র্যামোস।
শেষ মিনিটের 'ভিএআর' নাটকম্যাচে আসল রোমাঞ্চ তখনও বাকি ছিল। ম্যাচের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে (৯০+১৩ মিনিটে) ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্ডার ইয়োস্কা গাভার্দিয়োল একটি স্ক্র্যাপ গোল করে বল জালে জড়িয়ে দেন এবং ক্রোয়েশিয়া শিবিরে সমতা ফেরানোর উল্লাস শুরু হয়। কিন্তু রেফারি ভিডিয়ো অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR)-এর সাহায্য নেন।
দীর্ঘ পরীক্ষার পর দেখা যায় বিল্ড-আপের সময় পাসালিচ অফসাইডে ছিলেন, যার ফলে গোলটি বাতিল ঘোষণা করা হয়। রেফারির এই সিদ্ধান্তের পর ক্রোয়েশিয়ার সমর্থকরা মাঠে বোতল ছুঁড়তে শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে শেষ পর্যন্ত ২-১ স্কোরেই ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়ে পর্তুগাল।
প্রয়াত সতীর্থকে জয় উৎসর্গএই রোমাঞ্চকর জয়ের পরেও পর্তুগিজ ফুটবলারদের মনে আবেগ ছুঁয়ে গিয়েছিল। ঠিক এক বছর আগে গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রয়াত প্রাক্তন সতীর্থ আন্দ্রে জোতার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল এদিন। ম্যাচ জেতার পর রোনাল্ডো এবং দলের বাকি সদস্যরা জোতার ২১ নম্বর জার্সি হাতে তুলে ধরে প্রয়াত সতীর্থকে অশ্রুসজল চোখে এই ঐতিহাসিক জয় উৎসর্গ করেন।
আগামী সোমবার শেষ ১৬-র হাইভোল্টেজ ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্পেনের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল, যেখানে ফুটবল বিশ্ব দেখতে চলেছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো বনাম উদীয়মান তারকা লামিন ইয়ামালের মহাদ্বৈরথ।

