শান্তি আলোচনার মাঝেই হরমুজে বোমাবর্ষণ তেহরানের, ইরানের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সিঙ্গাপুরের জাহাজ
নিজস্ব প্রতিনিধি: ‘হরমুজ প্রণালী আর যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরবে না’— ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের ঘালিবাফের এই চরম হুঁশিয়ারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অশান্ত হয়ে উঠল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হরমুজ প্রণালীতে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজে ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালাল ইরান। ‘এভার লাভলি’ (Ever Lovely) নামের ওই বাণিজ্যিক জাহাজটিতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) এই হামলা চালিয়েছে বলে দাবি মার্কিন কর্মকর্তাদের। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, যখন সিঙ্গাপুরের মাটিতেই দু’পক্ষের মধ্যে স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই সিঙ্গাপুরের নৌযানের ওপর এই হামলা গোটা কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকেই খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে হওয়া ৬০ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা ছিল তেহরানের। কিন্তু ইরান সম্প্রতি সাফ জানিয়ে দেয়, তাদের নিজস্ব অনুমোদিত রুট বা জলপথ ছাড়া অন্য কোনও দিক দিয়ে জাহাজ চলাচল করলে তার নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া হবে না।
ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নিরাপত্তা সংস্থা ‘ইউকেএমটিও’ (UKMTO) জানিয়েছে, ওমানের ডাহির বন্দর থেকে সাড়ে সাত নটিক্যাল মাইল দূরে আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা (IMO) নির্ধারিত রুট ধরেই যাচ্ছিল সিঙ্গাপুরের কনটেইনার জাহাজ ‘এভার লাভলি’। সেই সময়ই একটি ইরানি বিস্ফোরক ড্রোন জাহাজটির ডানদিকের ‘ব্রিজ’ বা নিয়ন্ত্রণকক্ষে আছড়ে পড়ে। হামলায় জাহাজের হালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও সৌভাগ্যবশত কোনও নাবিক হতাহত হননি ।
এই হামলার জেরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বড়সড় আলোড়ন পড়ে গিয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে আটকে থাকা প্রায় ১১,০০০ বিদেশি নাবিককে নিরাপদে বের করে আনার যে উদ্ধারকাজ রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা (IMO) চালাচ্ছিল, সুরক্ষার অভাব দেখে তা সাময়িকভাবে স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি ইরান-আমেরিকা শান্তি আলোচনার পিঠে বড়সড় ছুরিকাঘাত। মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, ইরান যদি মৌখিক হুমকি দেওয়া বন্ধ করে বাস্তবে জাহাজের গতিবিধি আটকায়, তবে আমেরিকা তা চুক্তি লঙ্ঘন হিসেবে দেখবে এবং পাল্টা কঠোর ব্যবস্থা নেবে। সিঙ্গাপুরের বিদেশ মন্ত্রক যেখানে এই শান্তি প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছিল, সেখানে তাদের নিজেদের দেশের পতাকাবাহী জাহাজ আক্রান্ত হওয়ায় মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার ও পাকিস্তানের সমস্ত শ্রম জলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই হামলার পর আমেরিকা ফের ইরানের ওপর তেল বিক্রির নিষেধাজ্ঞা বহাল করে কি না, এখন সেটাই দেখার।

