রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের গোপন অস্ত্র ‘ডাইনি বাহিনী’, কী এই অস্ত্র? জানলে আপনিও চমকে যাবেন।
নিজস্ব প্রতিনিধি: ৪ বছরের বেশি সময় ধরে রাশিয়ার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেন। দীর্ঘ এই যুদ্ধের শুরুটা হয়েছিল তীব্র সম্মুখ প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে। তবে সময় যত গড়িয়েছে, যুদ্ধের গতিপথ ও কৌশল তত পরিবর্তিত হয়েছে। সম্মুখ সমরের প্রথাগত লড়াইয়ের বদলে এখন প্রযুক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও ফাঁদ পেতে শিকার ধরার মতো অভিনব সব গোপন পদ্ধতি রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে শুরু করেছে ইউক্রেন। এই মুহূর্তে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির অন্যতম প্রধান ভরসার শক্তি হয়ে উঠেছে ইউক্রেনের বিশেষ ‘ডাইনি বাহিনী’, স্থানীয় ভাষায় যাদের বলা হয় ‘ভিডমা’ (Vidma)। তাঁদের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও অভিনব কৌশলে যুদ্ধের ময়দানে রীতিমতো নাজেহাল হতে হচ্ছে রাশিয়াকে, প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য রুশ সেনা।
মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিক (The Atlantic)-এর একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইউক্রেনের এই আড়ালে থাকা ‘ছায়া যুদ্ধ’ ও ক্ষিপ্র গোয়েন্দা জালের চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে।
ইউক্রেনীয় লোকগাঁথা ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, ‘ভিডমা’ শব্দের অর্থ এমন এক নারী যিনি ‘গভীর বা অজানা জ্ঞান ও দক্ষতার অধিকারী’। সাবেক ইউক্রেনীয় এমপি লেসিয়া ওরোপেটসের মতে, ইউক্রেনের সংস্কৃতিতে ডাইনিদের জাদুটোনার জন্য নয়, বরং তাদের প্রজ্ঞা ও চারপাশের পরিবেশ বোঝার বিশেষ ক্ষমতার জন্য সম্মান করা হতো। বর্তমানে রুশ অধিকৃত অবরুদ্ধ অঞ্চলগুলোতে সক্রিয় ইউক্রেনের নারী গোয়েন্দা ও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের এই নামে ডাকছেন সামরিক কমান্ডাররা।
কীভাবে কাজ করছে এই ছদ্মবেশী বাহিনী? রুশ অধিকৃত এলাকাগুলোতে এই নারীরা অতি সাধারণ নাগরিক হিসেবে নিজেদের দৈনন্দিন কাজকর্ম যেমন—ক্লিনিক, স্কুল বা সরকারি অফিসে কাজ করেন। ফলে পুরুষদের তুলনায় তাদের ওপর রুশ সেনাদের সন্দেহ অনেক কম থাকে। কিন্তু গোপনে তাঁরা ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দাদের সঙ্গে এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে যুক্ত থাকেন এবং রুশ সেনাদলের অবস্থান, গতিবিধি ও অস্ত্রভাণ্ডারের নিখুঁত তথ্য চালান করে দেন।
এই বাহিনীর অন্যতম মারাত্মক কৌশল হলো ‘হানি ট্র্যাপ’ বা প্রেমের ফাঁদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে ছদ্মনাম ব্যবহার করে এই গোয়েন্দারা নিঃসঙ্গ রুশ সেনাদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
সম্প্রতি ইউক্রেনের দক্ষিণ অঞ্চলে অবস্থানরত এক চেচেন কমান্ডারের সঙ্গে এক ‘ভিডমা’ অপারেটিভ গভীর চ্যাটিং শুরু করেন। একপর্যায়ে ওই কমান্ডারের মন জয় করে তাঁর সামরিক ক্যাম্পের একটি ছবি পাঠাতে বাধ্য করেন তিনি। ছবিতে খুব আবছাভাবে ব্যাকগ্রাউন্ডে একটি সামরিক ম্যাপ দেখা যায়। সেই মানচিত্র বিশ্লেষণ করে ইউক্রেনীয় বাহিনী নিখুঁত ড্রোন হামলা চালিয়ে পুরো রুশ ঘাঁটিটি ধ্বংস করে দেয়।
ইউক্রেনের এই ‘মিডল-স্ট্রাইক’ কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো রুশ সেনাদের সম্মুখ সমরে পৌঁছানোর আগেই পেছনে থাকা অবস্থাতেই ধ্বংস করা। ডাইনি বাহিনীর দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ইউক্রেনের ড্রোন অপারেটররা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে।এই গোপন নেটওয়ার্ক রুশ সেনাদের মনে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরি করেছে যে, তারা এখন সাধারণ ইউক্রেনীয় নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলতেও আতঙ্ক বোধ করছে। যেকোনো সাধারণ নারীই যে ইউক্রেনের ‘ভিডমা’ বা ছদ্মবেশী ডাইনি হতে পারেন, এই সংশয় রুশ বাহিনীর মনোবল পুরোপুরি ভেঙে দিচ্ছে।

