আসক্তি-অনাসক্তি
শ্রীভগবান বলছেন -'কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন।' কেবল কাজেই তোমার অধিকার, কখনই তার ফলে নয়। আমাদের আসক্তি যেন অকর্মের প্রতিও না হয়। এই উপদেশ বা গুরুত্বপূর্ণ শ্লোকটি মানুষের মধ্যে বহু ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, ফলের দিকে না তাকিয়ে আমরা কাজ কিভাবে করতে পারি? অথচ এই শ্লোকটি গীতার মূল শিক্ষা। আসক্তি মানে লালসা, অনাসক্তি মানে নির্লিপ্ততা। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই বিশ্বে আমি একা নই। আমি যে কাজই করি, সে কাজেরই ফলটি, আমি গ্রহণ করি, আর সব ভুলে যাই। তা কিন্তু করা যাবে না। সমাজবদ্ধ জীব হিসাবে আমাদের যা কিছু আছে তা অন্য সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হবে। এটা আমার কাজ, সবকিছুই আমার, সব আমার— এই বৃত্তি ছাড়তে হবে। আমাদের ঘিরে যে মনুষ্য জগত রয়েছে তাকে বাদ দিয়ে আমরা মনুষ্য পদবাচ্য হতে পারি না। আমাদের চারিপাশের অন্য সব মানুষের কাছে আমরা কত ঋণী! তুমি যদি সমাজ থেকেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখো তুমিও সমাজের কাছে একজন নগণ্য ব্যক্তি হয়ে যাবে। তাই কাজের সেই ভাবটিকে আমাদের মনে রাখতে হবে, যা আমাদের সামনে ধরে রাখে সমাজ কল্যাণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ভাবটিকে। আমিই আমার কাজের একমাত্র ফলভাগী, এটা ঠিক নয়, অন্য ভাগীদারদের কথাও ভাবতে হবে। শ্রীরামকৃষ্ণের কথায়, কাঁচা বা অপক্ক "আমি" কে পাকা "আমি"তে উন্নীত করতে হবে। অনাসক্তি কার থেকে বেশি করতে হবে? আমাদের অহংবোধ থেকে, আমাদের জৈবতন্ত্রের কেন্দ্রে যে ক্ষুদ্র সত্তাটি রয়েছে তার থেকে অনাসক্তি চাই। আমাদের মধ্যে এই "ছোট আমি" যতক্ষণ না পরাহত হয়ে "বড় আমি" বিকশিত হয় ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা একটি ছোট মানুষই হয়ে থাকি। যতক্ষণ না আমরা তুমি বলতে শিখি ততক্ষণ আমাদের একটুও উন্নতি সম্ভব নয়। আমরা কাঁচা আমিই থেকে যাই। কোন পশুর মধ্যে অহংবোধ নেই। কোন পশু যদি এই অহংবোধের উদ্ভব ঘটাতে পারতো তবে আমরা এখানে থাকতাম না ; সেই পশুরাই জগতে আধিপত্য বিস্তার করত। এমনকি সদ্যোজাত শিশুর মধ্যেও এই অহং বোধ থাকে না। শিশুর বয়স দুই বছর বা আড়াই বছর হবার পরেই দেখা যায় সে বলছে আমি এটা চাই, আমি ওটা চাই। তাই আমরা শিশুর মত সরল হতে বলি। শিশুর মতো সরলতা থাকলে আমাদের দুঃখবোধ থাকে না।

