ত্বমসি নিরঞ্জনঃ
শিশুদের পাঠ্যসূচিতে কোন্ বিষয়গুলি পড়ানো হয় না আমাদের দেশে তা নিয়ে খুব একটা ভাবনা আমাদের নেই। আমরা টক ফলের বীজ বপন করব, কিন্তু সেই গাছ থেকে যদি মিষ্টি ফল না হয় তখন সমালোচনায় মুখর হব। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে যে দেবতা লুকিয়ে আছে তা প্রকাশ করার কত পথ আমাদের মনীষীরা বলেছেন, সেগুলি আমরা জানব না বা কাউকে জানাবোও না। অথচ মানুষ যখন স্বার্থপর আত্মকেন্দ্রিক অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে তখন মোমবাতি নিয়ে বেরিয়ে পড়বো। মনীষীরা বলেছেন, শিশুকে যদি যথার্থ মানুষ করে গড়তে হয়, তাহলে শৈশব থেকেই তাদের মধ্যে উপনিষদের মহৎ ভাবগুলি অনুপ্রবিষ্ট করিয়ে দিতে হবে, যাতে জ্ঞানের উন্মেষ হওয়ার পর থেকেই অনুশীলনের ফলে সেগুলি তাদের শোণিতপ্রবাহে মিশে যায়। পুরাণে বর্ণিত রানী মাদালসার দৃষ্টান্ত আমরা জানি। তিনি তাঁর সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই তাকে দোলায় দোল দিতে দিতে আত্মতত্ত্ব শোনাতেন—"ত্বমসি নিরঞ্জনঃ"। আমরা সেই অনন্ত ব্রহ্মাগ্নির স্ফুলিঙ্গ। পবিত্রতাই আমাদের স্বভাব, অপবিত্রতা নয়। পূর্ণত্বই আমাদের স্বভাব, অপূর্ণত্ব নয়। স্বামীজী বলছেন- হে ভ্রাতৃগণ, তোমাদের সন্তানগণকে জন্ম থেকেই জীবনপ্রদ, মহত্ত্ববিধায়ক, উচ্চ মহান তত্ত্ব শিক্ষা দিতে আরম্ভ করো। এই উপনিষদের শিক্ষা কেবল ভারতবর্ষকে নয়,সমগ্র পৃথিবীকে রক্ষা করবে। জড়বাদী সভ্যতার বহুবিধ সাফল্য সত্ত্বেও, সমাজ যদি তার ভিত্তি আধ্যাত্মিকতার উপর স্থাপন না করে, তবে তার ধ্বংস অনিবার্য বলে স্বামীজী মনে করতেন। আত্মস্বরূপজ্ঞানের অভাব থেকেই ভয়ের উদ্ভব হয়। মানুষ স্বরূপত নিত্য- শুদ্ধ- মুক্ত-স্বভাববান। এই স্বরূপ উপলব্ধির জন্যই মানুষ জেনে বা না জেনে চেষ্টা করে চলেছে। এই স্বরূপ উপলব্ধিই মুক্তি, এই মুক্তিই মানুষের চিরন্তন লক্ষ্য। "আত্মায় সকল শক্তি নিহিত"-এই মহাশিক্ষা লাভ করলে অতি দুর্বল অধঃপতিত মানুষের হৃদয়েও আশার সঞ্চার হয়। ভয়হীনতাই চারিত্রিক উৎকর্ষের সর্বোচ্চ অভিজ্ঞান। আত্মবিশ্বাস ও আত্মশ্রদ্ধার আবির্ভাব মানুষকে নির্ভীক করে তোলে। তাই জগতকে যদি কোন ধর্ম শেখাতে হয় তা হলো উপনিষদের মহান মন্ত্র " অভীঃ"। লৌকিক ও আধ্যাত্মিক সকল বিষয়েই "অভীঃ" এই মূলমন্ত্র অবলম্বন করতে হবে। কারণ ভয়ই পাপ ও অধঃপতনের নিশ্চিত কারণ। যে মুহূর্তে মানুষের মনে ভয় বাসা বাঁধে, মানুষ শক্তিহীন হয়ে পড়ে। তার বিশ্বাস, তেজস্বিতা, বীর্য- সবই অন্তর্হিত হয়। আর যে মুহূর্তে মানুষ এই ভয়কে জয় করে স্বর্গ তার করতলগত হয়।

